একজন বনফুল

eliza-1.jpg

ইলিজা বিনতে এলাহী

ইলিজা বিনতে এলাহী:  ইউরোপের অন্যান্য শহরের মত নরওয়ের রাজধানী ওজলোর সিটিসেন্টার পর্যটকদের আকর্ষণের স্থান । দুপুর গড়ানোর সাথে সাথে সেই জায়গা গুলো মনে হয় নিজের প্রান ফিরে পায় । রাস্তার দুপাশে সারি বাধানো ছাদ খোলা রেস্টুরেন্ট , সেই রেস্টুরেন্টের পাশে হয়তো কেউ গান শুনিয়ে , কেউ গিটার বাজিয়ে উপার্জন করছে , কিছু দূর যেতেই আবার হয়তো দেখা যাবে -কেউবা তার ছবি আকার দক্ষতা প্রদর্শন করছে , বিভিন্ন স্ট্রিটফুডের মেলা সব মিলিয়ে এক উৎসব পালিত হয় গ্রীষ্মের প্রতিটি দিন ।

সেই রকম এক বিকেলে আমি এবং আমার হাসব্যান্ড সিটি সেন্টারের রাস্তা ধরে যাচ্ছিলাম ,গন্তব্য ছিল নরিজিয়ান রয়্যাল প্যালেস দেখবো । কিছুদুর যেতেই দেখতে পেলাম এক জায়গায় বেশ লোকের সমাগম । আমিও গেলাম দেখবার জন্য , কাছে গিয়ে দেখলাম একজন স্প্রে-পেইন্ট আর্টিস্ট খুব সুনিপুন ভাবে একাগ্রচিত্তে তার কাজ করে যাচ্ছে । অনেক লোক তার ছবি আঁকা দেখছে এবং একটি মেয়ে ভিডিও করছে । তার কাজের জায়গার সামনে একটি লেখার উপর চোখ চলে গেল , সেখানে লেখা আছে “Feel free to look at the painting’ ।আর তার পাশেই পুরানো দিনের হিন্দি গান চলছে । আমিও সবার সাথে তার ছবি আঁকা দেখছিলাম । যেহেতু গন্তব্য ছিল অন্যত্র তাই বেশি দেরী না করে প্যালেসের দিকে রাওনা হলাম । সন্ধ্যা হব হব করছে সেই একই রাস্তা দিয়ে যখন ফিরছি তখন আবার তাকে দেখতে পেলাম ।

কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি একদম একা । কথা বলার জন্য এগিয়ে গেলাম । প্রথমে অভিবাদন জানিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম “ আর ইউ ফ্রম ইন্ডিয়া “ ? আমি হিন্দি গানের কথা মাথায় রেখে ইন্ডিয়ার কথা বললাম । উনি বেশ কঠিন গলায় বললেন “ নো , আই এম ফ্রম বাংলাদেশ “ । সাথে সাথে আমি হেসে বললাম আমিও বাংলাদেশি । তারপর তার সাথে প্রায় ঘণ্টা খানেক আড্ডা হলো ।অনেক পথ হাটার কারনে আমরা বেশ ক্ষুধার্ত ছিলাম । কিন্ত সেই আর্টিস্টের সাথে আলাপচারিতায় ,পাপ্পু মানে আমার হাসব্যান্ড সেই কথা বলার সুযোগ পাননি । আলাপকালে জানলাম আর্টিস্ট এর নাম বনফুল , বাড়ি নওগাঁ জেলায় । উনি প্রতি সামারে দুই মাসের জন্য ইউরোপে আসেন । প্রায় ৭ বছর ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তিনি ঘুরে বেরাচ্ছেন । তবে দু’বছর হল নরওয়ে আসছেন । ইউরোপে আসার কারন ছিল পড়াশুনা ,প্রথমে গ্রীসে আসেন পরাশুনা করতে , তারপর শেষ না করেই ফিরে যান বাংলাদেশে । ইউরোপ ভালো লাগার কারনে বার বার ফিরে আসেন এখানে এবং এভাবেই তার কাজ গুলো প্রদর্শন করেন । নরওয়েতে এখন নিয়মিত আসবার কারন হল তার প্রেমিকা নরিজিয়ান এবং যে মেয়েটি তার কাজ ভিডিও করছিল সেই তার প্রেমিকা । মেয়েটি তার ইউটিউব চ্যানেলে সেই ভিডিও গুলো নিয়মিত আপলোড করে । ইউটিউব চ্যানেলের নামও একটি কাগজে লেখা আছে তার বসার জায়গার সামনে । নিজের কাজ প্রদর্শনের জন্য নরওয়ে সরকারের অনুমতি নিতে হয় যদি আপনি সেই দেশের নাগরিক না হন । বনফুল আমাকে তার অনুমতি পত্র বের করে দেখালেন । দু মাসের জন্য রাস্তা ভাড়া বাবদ তাকে দিতে হয় সেই দেশের টাকায় ২০০০০ টাকা । আমি থাকতে থাকতে দেখলাম সেই পুরো এলাকায় তিনি বেশ জনপ্রিয় । অন্য আরও একজন পর্যটক এসে তার কাছে সময় নিয়ে গেল রাতে তার ভিডিও করবে বলে । অন্যান্য স্ট্রিট আর্টিস্টরাও এসে তার সাথে কুশল বিনিময় করতে দেখলাম । আমি বনফুলের কাছে অনুমতি নিলাম তার সাথে এই সাক্ষাতের কথা আমি সোশ্যাল মিডিয়াতে লিখবো বলে । বনফুলের কাছে বিদায় নিয়ে আমরা খাবার খোঁজে গেলাম । রাতের বেশ খানিকটা সময় আমরা বনফুল আর নরিজিয়ান খাবার নিয়ে কাটালাম ।

Top