জনসম্পৃক্ত পর্যটনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে কেরালা ট্যুরিজম

unnamed-1.jpg

জাহাঙ্গীর আলম শোভন:

কমুউনিটি বেজড ট্যুরিজমে সারা বিশ্বের জন্য এক নতুন ধারণা নিয়ে এলো কেরালার পর্যটন বিভাগ। আর টি বা রেসপন্সসিবল ট্যুরিজম নামে এই ধারণায় মুলত স্থানীয় জনগনকে সম্পৃক্ত করে তাদের দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে ট্যুরিস্ট স্পট গুলোর উন্নয়ন সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সেগুলোতে পর্যটকদের যাবতীয় সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখান জীবন ও জীবিকাকে কাছ থেকে দেখানোর জন্য কৃষি ও গ্রামীণ জীবন ভিত্তিক কয়েকটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। সেগুলোর দিনকে দিন জনপ্রিয়তা কেরালার দায়িত্বশীল পর্যটনকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করে তুলছে।

কেরালা, ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের অঙ্গরাজ্য যা  ভারতবর্ষের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্ত । মোট ১৪টি  প্রশাসনিক জেলা বা  বিভাগ নিয়ে গঠিত। এই রাজ্যেরপ্রধান শহরগুলি হল থিরুবনন্তপুরম, কোচি এবং কোজিকোড। এই রাজ্যে মোট তিনটি আন্তজাতিক বিমানবন্দর রয়েছে।

৩৮,৮৬৪ বর্গ কিমি আয়তনের বৈচিত্রময় কেরালা রাজ্য  31,84,1374 জনসংখ্যা নিয়ে মালয়ালাম ভাষার পাশাপাশি ব্যাপক প্রচলিত ইংরেজি ভাষারও  ভাব আদান প্রদান করে থাকে।
রাজ্যের রাজধানী : থিরুবনন্তপুরম (ত্রিবান্দ্রম)। হিন্দু ধর্ম প্রধান হলেও প্রচুর খ্রীষ্টধর্ম অনুসারী রয়েছে, রয়েছে মুসলিমও। গ্রীষ্মপ্রধান এই অঞ্চলে  ফেব্রুয়ারি-মে (24-33oC) পর্যন্ত গরম পড়ে।  বর্ষাকাল : জুন-আগস্ট (22-28oC), অক্টোবর – নভেম্বর।  শীতকাল : নভেম্বর – জানুয়ারি(22-32oC)

ভারতবর্ষের কেরালা রাজ্যের কোট্টায়াম জিলার একটি পর্যটন গ্রাম হচ্ছে কুমারকম। এই অঞ্চলটি বিপুল বৈচিত্রপূর্ণ উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের বাসস্থল এবংকৃষিকাজ ও মৎস শিকার এখানকার প্রধান পেশা। কুমারকম তার সুষম ক্রান্তীয় জলবায়ু শৈলী-সহ বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রের একটি অন্যতম অপরূপপর্যটন গন্তব্যস্থল। এখানকার পর্যটন জনপ্রিয় হলেও একে আরো জনপ্রিয় করার জন্য দায়িত্বশীল পর্যটনের অধীনে কুমারকমে সামাজিকদায়বদ্ধতার কর্মসূচি শুরু হয় ২০০৮ সালে।

১. গৃহবধুদের সম্পৃক্ততা

কুমারকমের উৎসাহী ও পারঙ্গম গৃহবধূদের সম্পৃক্ত করে একটি সাংস্কৃতিক দল গড়ে তোলা হয়েছে, যার নাম সুবর্ণ সাংস্কৃতিক দল, যাঁরা পর্যটকদেরসামনে বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় থিরুভিথিরা, কোলকালি, ভাত্তাকালি।

২. কিশোর কিশোরীদের সম্পৃক্ততা

কুমারকমের পর্যটনের আরেকটি নতুন ও অভিনব দিক হল শিশু-কিশোরদের নিয়ে পেশাদারী শিঙ্কারি মেলাম দল গঠন করা। এসব স্থানীয় পেশা বিচ্ছিন্নভাবে বিদ্যমান থাকলেও সেগুলো বর্তমানে একটি পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে। ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কুমারকমের শিশু ও মহিলাদের বহু ছোট ছোট দল এই উৎসবে অংশগ্রহণ করছে। গন্তব্যস্থলগুলিতে কর্মরত হস্তশিল্প ও চিত্রশিল্প বিভাগগুলি লাভের মুখদেখছে এবং এর সঙ্গে স্মারক সামগ্রীগুলির বা সুভ্যেনির প্রোডাক্টস উন্নয়ন ও বিপণনের কাজও চলছে। পর্যটকদের জন্য কোনো স্থানের স্মারক পন্য ক্রয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

৩.  গ্রামীন মানুষ ও কৃষকদের সম্পৃক্ততা

কুমারকমের জীবনযাত্রার অজানা বিষয়কে জানার জন্য দুটি প্যাকেজ চালু করেছে রাজ্য সরকার। একটি হলো কুমারকমে গ্রাম্য জীবনেরঅভিজ্ঞতা অন্যটি কৃষকদের সঙ্গে একটি দিন।  এই দুটি প্যাকেজই বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। এসব কার্যক্রম থেকে অর্জিত অর্থ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত পরিবারগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে এইরকম আরও প্যাকেজ তৈরীর কথা ভাবছে টুরিজম বিভাগ।

দায়িত্বশীল পর্যটনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পতিত জমিগুলিকে কৃষিকাজের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করা। 56 একর পতিত জমিকে সব্জি ও ভেষজগাছপালা চাষের ক্ষেত্র করে তোলা হয়েছে। এই সফল আয় উপর্জানমূলক কর্মসূচি বজায় রয়েছে এবং কুমারকমের অন্যান্য অঞ্চলগুলিতেও ছড়িয়েপড়ছে।

৪. আদীবাসীদের সম্পৃক্ততা

কন্দল কাদুর পরিচর্যা নামক একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এটা আসলে বন পরিচর্যা যার দায়িত্বে থাকবে স্থানীয় আদিবাসীরা। বাদাবন (কন্দল কাদু)-এর মতো প্রাকৃতিক সম্পদের উপর কুমারকমে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে। বাদাবনের পরিচর্যায় এখানকার একটি আদিবাসী যাদের গোত্র নাম কন্দলাম্মাচি তাদেরকে কাজে লাগানো হয়েছে এবং তাঁদের উদ্যোগে প্রতিটি বাড়িতেই কন্দলের বীজ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। কন্দল এক প্রকার গাছ।

 

৫. মৎসজীবিদের সম্পৃক্ততা

এই অঞ্চলের পতিত জলাশয়গুলির উপর একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। এগুলোর পরিমাণ কতো এবং সেগুলোকে কিভাবে কাজে লাগানো যায় সেজন্য। এই সমীক্ষা ও গবেষণার উপর ভিত্তি করে এই সমস্ত পতিত জলাশয়গুলিতে মাছ ও পদ্মফুলের চাষ শুরু করা হয়েছে।  এতে একদিকে যেমন সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে অন্যদিকে মাছের উৎপাদন ত্বরান্বিত হয়েছে। এখানে উৎপন্ন মাছ পর্যটক নির্ভর হোটেলগুলিতে যায় আরপদ্মফুলগুলিকে  পর্যটকদের আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। বিদেশী ফুলের পরিবর্তে স্থানীয় এবং দেশীফুলে দেশী শুভেচ্ছায় পর্যটকেরাও খুশি হয়। স্থানীয় ফুলটাকে পরিচিত করা হয় আর এটি কাজেও লাগে। হোটেল রিসোর্ট ও ট্যূর অপারেটর কোম্পানীগুলো অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাতে ফুলগুলো কিনে নেয়। এই আইডিয়া এখন অন্য রাজেও ছড়িয়ে পড়ছে।

৬. তরুনদের সম্পৃক্ততা

সাইকেলে চড়ে ভ্রমণ করার সুযোগ রয়েছে আগুন্তুকদের। পর্যটন প্যাকেজের মধ্যে সাইকেলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাইকেল চালিয়ে ঘোরাররোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা পর্যটকদের আকর্ষিত করে এবং এটি উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। হোটেল ও পর্যটকাবাসগুলি সাইকেল ভাড়া দেয় এবং এটিও এখনএকটি ভাল ব্যবসার পসরায় পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামের তরুন যুবকরা সাইকেল ভাড়া দিয়ে দু-পয়সা কামানোর সুযোগ পেয়েছে।

হোটেল ও পর্যটকাবাসগুলির শক্তি ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের কাজটিকে সেরে ফেলা হয়েছিল যাতে একই সময়ের মধ্যে গোটাঅঞ্চলটি আরও বেশি পরিবেশ-বান্ধব হয়ে ওঠে। পর্যটন শিল্পের অংশীদার (হোটেল মালিক, রেস্তোঁরা মালিক, ভ্রমণ পরিচালক, ভ্রমণ-প্রতিনিধি, স্মারকসামগ্রী বিপণীর মালিক, পর্যটন দ্রব্য সরবরাহকারী বিভিন্ন ধরনের সংস্থাগুলি ইত্যাদি), স্থানীয় স্বশাসনের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, NGO/CSO-গুলি,সরকারি আধিকারিক, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম প্রভৃতির তরফে সম্পূর্ণ নিবিষ্ট চিত্তে কাজ করার ফলস্বরূপ দু’বছরের মধ্যেই যথেষ্ট সাফল্যের মুখ দেখাগেছে। দায়িত্বশীল পর্যটনের ধারণাকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে এ রাজ্যের সর্বপ্রথম পর্যটন কেন্দ্র হল কুমারকম এবং নিজের সাফল্যের কাহিনী সারাবিশ্বকে শুনিয়ে, এই স্থানটি

 

Top