ফিরে দেখা: আমার প্রথম কেওক্রাডং অভিযান- মারুফ রেজা রিপন

maruf-bin-alam-1-780x509.jpg

১৮ই এপ্রিল, ১৯৯৮। আজকে প্রায় ১৯ বছর পর যখন তারিখটার দিকে তাকাই তখন নতুন করে শিহরণ জাগে। এই দিনেই আমি আমার দুই বাল্যবন্ধু রেজাউল ইসলাম (রেজা) আর রিপন চন্দ্র দাসকে নিয়ে কেওক্রাডং চূড়া স্পর্শ করেছিলাম। এখনকার অভিযাত্রীরা কল্পনাও করতে পারবে না কতোটা দুর্গম ছিল তখনকার বান্দরবান। পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ছাড়া, সম্পূর্ণ অজানা-অচেনা পাহাড়ি জঙ্গলের মধ্য দিয়ে অনিশ্চিত একটা অভিযান ছিল সেটা। অদ্রি

আমাদের প্রথম কেওক্রাডং অভিযানের কাহিনী বর্ণনা করতে গেলে প্রথমেই এর পটভূমিটা জানাতে হয়। ছোটবেলা থেকেই পাহাড়-জঙ্গল আমাকে খুব টানতো। চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ছিল আমার গ্রামের বাড়ি, বাড়ির ৫-৬ কিলোমিটার দূরেই পাহাড়, পাহাড়ের উপর রাবার বাগান। আরেকটু দূরে গেলেই চা বাগান। আমাদের গ্রাম থেকেই সীতাকুণ্ড রেঞ্জের নীল পাহাড়গুলো দেখা যেত। গ্রামে আমার সমবয়সী চাচাতো ফুপাতো ভাইদের জিজ্ঞাসা করতাম ঐ দূরের নীল পাহাড়ে যাওয়ার রাস্তা কোনটা, যেতে কত সময় লাগবে? কেউ বলতো ১-২ দিনের হাঁটার পথ, আবার কেউ কেউ উত্তর দিত ওখানে যাওয়ার কোন রাস্তা নেই। উত্তর শুনে আফসোস হতো। আরেকটু বড় হলে বাসা থেকে হয়তো দূরের ঐ নীল পাহাড়ে যাওয়ার অনুমতি মিলতো।

এর মধ্যেই হঠাৎ গ্রামের মাঠে সাইকেল চালানোটা শিখে ফেলি। তখন আমি ক্লাস টুতে পড়ি। বছরে অন্তত চার থেকে ছয়বার গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হতো। প্রতিবার কমপক্ষে সাত দিন থাকতাম। এই সময়টুকু আমি ছিলাম স্বাধীন, কারণ আমার মা যিনি আমাকে চোখে চোখে রাখতেন, তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না বাড়ির আঙ্গিনা পেরিয়ে আশেপাশের বন-জঙ্গল থেকে আমাকে খুঁজে বের করা। সাইকেল চালানো শেখার পর আমার দুরন্তপনার পরিধি আরও বেড়ে গেল। ঘণ্টা প্রতি তিন টাকায় সাইকেল ভাড়া করে খাগড়াছড়ি হাইওয়ে ধরে কাছের পাহাড়ে চলে যেতাম। কিন্তু পাহাড়ের বেশি গভীরে যাওয়া আবার মানা ছিল। কারণ মাঝে মাঝে শান্তি বাহিনীর লোকজনের আনাগোনা হতো এই পাহাড়গুলোতে। সাইকেলে চড়ে কোন পাহাড় চূড়ায় বসে বালক চোখে অবাক বিস্ময়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতাম আর অপেক্ষা করতাম কবে আরো বড় হয়ে পাহাড়ের আরো গভীরে যাব।

এস.এস.সি. পরীক্ষার পর বাবা-মার ইচ্ছায় এবং নিজের অনিচ্ছায় কলকাতার আশুতোষ কলেজে ভর্তি হলাম এইচ.এস.সি.তে। কয়েক মাস পরেই আমার স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপটা পেয়ে গেলাম। ভারতে পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণের জন্য সে দেশের সরকার অনুমোদিত বিভিন্ন ক্লাব এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। এমনই একটি কলকাতা ভিত্তিক ক্লাব ‘চড়াই-উৎরাই’ ক্লাবের একটা প্রশিক্ষণ শিবিরে (১৯৯৪) যুক্ত হয়ে গেলাম। চার দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ হল পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের সীমান্তবর্তী বেল পাহাড়ি নামক রুক্ষ পর্বতময় এলাকায়। প্রশিক্ষণ শেষে নিজেকে আরও আত্নবিশ্বাসী লাগলো। অন্তত বাংলাদেশের যেকোন পাহাড়ে যে চড়তে পারব সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ রইল না।


প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অন্যদের সঙ্গে (আমি সর্ব বামে)


এবার ফিরে আসি ১৯৯৮ সালে আমার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অভিযান কেওক্রাডং অভিযানের গল্পে। ঘটনা শুরু হয়েছিল ১৯৯৮ সালের জানুয়ারিতে। সেদিন ছিল ঈদুল-ফিতর। ঈদের দিন বন্ধু রেজার বাসায় দাওয়াত খেতে যাওয়াটা আমার আর রিপনের জন্য এক প্রকার নিয়ম হয়ে গিয়েছিল। সেদিনই রেজার পড়ার টেবিলে ভোরের কাগজের ‘অবসর’ ম্যাগাজিনের একটা পুরোনো সংখ্যা নজরে পড়লো। ম্যাগাজিনের কভার স্টোরি ছিলো সাংবাদিক আদিত্য কবিরের লেখা ‘আমি বিজয় দেখিনি’।

এখানে কয়েকটা তথ্য জেনে রাখা দরকার। ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে শান্তি বাহিনীর প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমার মধ্যে শান্তি চুক্তি হয়। এই চুক্তির ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অসীম সৌন্দর্যের দুয়ার সকলের জন্য উন্মুক্ত হয়। তারই ফলশ্রুতিতে আদিত্য কবির অভিযানে বের হন। সেই সময় পত্র পত্রিকায় একটা খবর প্রচার হচ্ছিল যে, কেওক্রাডং বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় না। এর থেকেও উঁচু একটা পাহাড় আবিস্কার হয়েছে যার নাম তাজিংডং। সরকারিভাবে এর নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘বিজয়’। ২৬ শে মার্চ ১৯৯৮ তারিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন ‘বিজয়’ শৃঙ্গটি উদ্ভোধন করার কথা।

কিন্তু আদিত্য কবির বিজয়ের সন্ধানে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছেন। কারণ, অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দেওয়ার মত পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না। তবে কয়েকটা দরকারি তথ্য তার লেখায় আমরা পেলাম-

[১] বিজয় চূড়াটি বান্দরবানের রুমা থানায় অবস্থিত।

[২] পথ অত্যন্ত দুর্গম। তাই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া বিজয় অভিযানের চেষ্টা না করাই ভাল।

[৩] দল যত ছোট হয় ততই ভাল।

[৪] প্রয়োজনীয় খাবার ও ঔষধপত্র সাথে নেওয়া আবশ্যক।

রেজার বাসায় বসে আমরা তিন বন্ধু সাথে সাথেই সিদ্ধান্ত নিলাম আমাদের ‘বিজয়’ অভিযানে যেতে হবে। বিশেষ করে আমি এ ব্যাপারে খুবই উৎসাহী ছিলাম। কারণ ভারতে নেওয়া আমার পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণটা কাজে লাগানোর সুযোগ খুঁজছিলাম। ঠিক হলো আমার তত্ত্বাবধানে ফিজিক্যাল ট্রেনিং হবে রামপুরার বনশ্রীতে (বনশ্রী তখন ফাঁকা গড়ের মাঠ)। রিপন দায়িত্ব নিল আদিত্য কবিরকে খুঁজে বের করার (তার কোন এক দাদা সাংবাদিক ছিলেন ভোরের কাগজে)। রেজা দায়িত্ব নিল দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেতে হলে কি কি ঔষধ সাথে নিতে হবে তার একটি তালিকা তৈরি করা ও যোগাড় করা (যেহেতু রেজার চাচা ডাক্তার)।

ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকেই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু হল। অলস প্রকৃতির রিপন প্রথম দিন থেকেই ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকল। চিকন-চাকোন রেজা এদিক দিয়ে মোটামুটি দায়িত্ববান ছিল। তবে কষ্টকর ফিজিক্যাল ট্রেনিংয়ে তাদের নিতান্ত অনাগ্রহ দেখে কিছুদিন পর আমাকে বিকল্প চিন্তা করতে হল।

এরই মধ্যে রিপন খবর আনলো আদিত্য কবির ভোরের কাগজ নয়, আনন্দলোক নামক একটা ম্যাগাজিনে কাজ করেন। সময় নষ্ট না করে তিন পণ্ডিত মিলে হাজির হলাম আদিত্য কবিরের অফিসে। তার সাথে কথা বলে তো আমাদের আক্কেল গুড়ুম। আদিত্য বান্দরবান শহর পর্যন্তই গেছেন। বান্দরবান গিয়ে সেনাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলো সাজিয়েই তিনি ভোরের কাগজে রিপোর্টটা করেছেন। আমার ধারণা ছিল তিনি রুমা হয়ে পাহাড়ি পথ ধরে কিছুদূর গিয়েছিলেন। আদিত্য কবিরের কাছ থেকে কোন প্রয়োজনীয় তথ্যই আমরা পেলাম না। তিনি বরং কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ করলেন আমাদের-

[১] রুমা থেকে বিজয় পর্যন্ত হেঁটে যেতে আর্মিদের লাগে ৪ দিন। আর আমাদের মতো আনাড়ি শহুরে লোকদের জন্য তা ছয় দিনের পথ।অদ্রি

[২] আর্মি ক্যাম্পে গেলে তারা আমাদের ম্যাপ এবং অন্যান্য তথ্য দিয়ে সাহায্য করবে।

[৩] পথে নিজেদের রান্না করে খেতে হবে। তাই সাথে করে হাঁড়ি-কুড়ি নিয়ে যাওয়াই ভালো। (কারণ আমরা পাহাড়িদের রান্না খেতে পারব না)।

এদিকে ফিজিক্যাল ট্রেনিংয়ের বিকল্প হিসেবে ঠিক হলো, ছাব্বিশে মার্চ আমরা গাবতলী থেকে হেঁটে নবীনগরে জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাবো। ২৪ কিলোমিটার পথ ৫ ঘণ্টায় পাড়ি দিয়ে বুঝলাম ফিটনেসটা আমাদের যথেষ্ট ভালোই আছে। কিন্তু তখনও বুঝিনি সমতলে হাঁটা আর পাহাড়ি চড়াই-উৎরাই পার হওয়ার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক।

সব প্রস্তুতি শেষ করে ঠিক হলো ১৫ এপ্রিল রাতে আমরা বান্দরবানের উদ্দেশে রওনা দেব। হাতে অপর্যাপ্ত তথ্য, টাকা-কড়ির অপ্রতুলতা, অচেনা-অপরিচিত জায়গা ইত্যাদি সঙ্গী করে চট্টগ্রামগামী তূর্ণা নিশীথায় চড়ে বসলাম। এমন অনিশ্চিত আর বিপদজনক অভিযানে যাওয়ার অনুমতি মিলবে না বিধায় মাকে বললাম চট্টগ্রাম বেড়াতে যাচ্ছি। ব্যাপারটা আরো বিশ্বাসজনক করার জন্য ১৬ তারিখ সকালে বড় ফুপুর বহদ্দারহাটের বাসা থেকে মাকে ফোন করে জানালাম আমরা চট্টগ্রামে ঠিকমতো পৌঁছেছি। তবে, সাথের বিশাল লটবহর আর প্রস্তুতি দেখে মা ঠিকই সন্দেহ করেছিলো আমরা কিছু একটা ঘটনা ঘটাতে যাচ্ছি।

চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে বান্দরবানগামী বাসে উঠে দুই ঘণ্টার মধ্যে বান্দরবান শহরে পৌঁছলাম। তখন ঘড়িতে সাড়ে দশটা-এগারোটা হবে। পৌঁছেই বান্দরবান বাজারের কাছে একটা বোর্ডিংয়ে উঠলাম। এরই মধ্যে রেজার পুরোনো হাঁটুর ব্যথাটা শুরু হওয়ায় তাকে রেখেই আমি আর রিপন বান্দরবান ক্যান্টনমেন্টে গেলাম ম্যাপ ও আনুষাঙ্গিক কিছু তথ্য জোগাড়ের জন্য। এম.পি. চেক পোস্টে এক সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচিয় হল। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ বান্দরবানে চাকুরি করেছেন বলে জানালেন। আমরা সেনা সদস্যদের কাছে আমাদের বান্দরবান আগমনের হেতু আর পরিকল্পনা খুলে বললাম। উদ্দেশ্য শুনে সেই কর্মকর্তা যা বললেন তা শুনে আমাদের আক্কেল গুড়ুম। তার দেওয়া তথ্য ও বিশেষজ্ঞ মতামত ছিল অনেকটা এরকম-

[১] শান্তি চুক্তি তো শুধু কাগজে-কলমে হয়েছে। আসলে পাহাড়ে এখনো অশান্তি বিরাজ করছে। খুন-অপহরণ এখানকার নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা।

[২] আপনারা তো রুমা পর্যন্তই যেতে পারবেন না। তার আগেই পাহাড়িরা (শান্তিচুক্তির বিরোধী পক্ষ) আপনাদের অপহরণ করবে। সবকিছু লুটপাট করে মাথাপিছু দশ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করবে। আর আপনারা তো ছাত্র, আপনাদের জিম্মি করতে পারলে ওরা বরং খুশিই হবে। (ছাত্রত্বের সঙ্গে অপহরণের কি সুবিধা তা অবশ্য ঐ ভদ্রলোক ব্যাখ্যা করেননি)

[৩] আপনারা বিপদে পড়লে তো সরকার পক্ষ হতে আপনাদের জন্য কিছুই করবে না। সরকারের কি ঝামেলার অভাব আছে, যে আপনাদের উদ্ধারের ঝামেলা করতে যাবে।

[৪] আপনাদের বাবা-মায়েরাও কেমন, এমন বিপদজনক দুর্গম এলাকায় বাচ্চা (!) ছেলেদের একা আসতে দিয়েছে।

[৫] আর পাহাড়ি রাস্তা অতি ভয়ংকর, অনেক কষ্ট। আপনারা শহরের আরামপ্রিয় মানুষ। আমরাই সহজে পাহাড়ে উঠতে চাই না (কষ্টের ভয়ে), আর আপনারা পারবেন কোথা থেকে। কাজেই ভালোয় ভালোয় মায়ের কোলে ফিরে যান।

[৬] রুমা পার হয়ে চিম্বুক, তারপর কেওক্রাডং যেতে ৩-৪ দিন সময় লাগবে।

ঐ ভদ্রলোকের কথায় সেনাসদস্যরাও তাল দিলো। শুধু তালই দিল না, আরও তিনগুন বাড়িয়ে বলল। গত তিন মাসে তিল তিল করে যে উৎসাহ ও সাহস জোগাড় করেছিলাম তা মুহূর্তেই উবে গেল। আজকে এতো বছর পর ভাবি সেদিন যদি আমরা ত্রিরত্ন ভয় পেয়ে পিছু হটে যেতাম তবে হয়তো বাংলাদেশের ট্রেকিং ইতিহাস ১৮ই এপ্রিল ১৯৯৮ সালে শুরু না হয়ে আরও পরে শুরু হতো। কে জানে, হয়তো শুরুর জন্য এখনও অপেক্ষা করতে হতো।

আমার আর রিপনের মানসিক অবস্থা তখন বলে বোঝানোর মতো নয়। এতো কষ্ট করে, এতো আশা নিয়ে বান্দরবান এসে শেষে কি খালি হাতেই ফিরে যেতে হবে? চিন্তা করে দেখলাম, এখনো তো কোন বাধা পাইনি। যেতে থাকি, বাধা পেলে তখন চিন্তা করা যাবে। ঐ সরকারি কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাস করে জানলাম, সকাল ৯টা, দুপুর ১২টা ও বিকাল ৩টায় বান্দরবান থেকে রুমার উদ্দেশে চান্দের গাড়ি ছাড়ে। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম সাড়ে ১১টা বাজে। রিপনকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বোর্ডিংয়ে ফিরে আসলাম। রেজাকে সংক্ষেপে সব তথ্য জানিয়ে বললাম, চল এক্ষুনি রুমার জিপ ধরি, তারপর যা থাকে কপালে।

জিপ স্ট্যান্ডটি একটা ছোট্ট পাহাড়ের কোলে অবস্থিত, এর তিনদিকেই পাহাড়। মাইলস্টোনে দেখলাম লেখা রয়েছে চিম্বুক ২৪ কিলোমিটার আর রুমা ৫৪ কিলোমিটার। তার মানে চিম্বুক পার হয়েই রুমা যেতে হয়। আমার তখন ঐ সরকারী কর্মকর্তার মাথায় কাঁঠাল ভাঙ্গতে ইচ্ছা হচ্ছিলো। পরে এই ইচ্ছাটা আরো প্রবল হয়ে উঠেছিলো যখন আমরা অভিযান শেষ করে ফিরে আসি।অদ্রি

তখনও দেশে ডিজিটাল ক্যামেরার যুগ শুরু হয়নি। তাই আমি আর রেজা এনালগ ক্যামেরাতেই আশেপাশের সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো বন্দী করতে থাকি। হঠাৎ খেয়াল করলাম রিপন আশেপাশে নেই। বড়ই দুশ্চিন্তার ব্যাপার, অভিযানের শুরুতেই কি অপহরণের ঘটনা ঘটলো নাকি? খোঁজ করতেই দেখলাম, রিপন বদনা হাতে টয়লেটের সন্ধানে দৌড়াচ্ছে (রিপন পরে জানিয়েছিল বান্দরবানের ঐ সরকারী কর্মকর্তার ভীতিকর কথাবার্তায় চিন্তায় তার ডায়রিয়া শুরু হয়েছিল)। কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবো ভেবেছিলাম কিন্তু তখনই রেজা জানালো তার ক্যামেরাটা ঠিক মতো কাজ করছে না।

জিপস্ট্যান্ডে বেশিরভাগ যাত্রীই পাহাড়ের স্থানীয়। সবাই অবাক দৃষ্টিতে আমাদের লক্ষ্য করছে। সে সময় বান্দরবানবাসীরা কালেভদ্রে ট্যুরিস্টের দেখা পেত। ট্যুরিস্টরা যেত শৈলপ্রপাত, মাঝেমধ্যে চিম্বুক পাহাড়ে। তাই আমাদের মতো ট্যুরিস্টদের প্রতি তাদের কৌতুহল থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা মনে করছিলাম এরা সবাই শান্তিবাহিনীর সদস্য, আমাদেরকে দেখে তারা অপহরণের পরিকল্পনা করছে। যতবার তারা আমাদের দেখছে ততোবার আমি আতঙ্কিত হচ্ছি। ভুল তথ্য যে কতটা ক্ষতিকারক হতে পারে তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম কেওক্রাডং অভিযানে।

আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে দুপুর একটায় রুমার উদ্দেশে আমরা চাঁদের গাড়িতে চেপে বসলাম। ব্রিটিশ আমলের জিপ আর মাইক্রোবাস-উন্নত বিশ্বে যেগুলো এখন যাদুঘরের শোভা বর্ধন করে-সেগুলোই এখানে চাঁদের গাড়ি বা চান্দের গাড়ি  নামে পরিচিত। যদিও মনে হয় একটু পরেই গাড়িগুলো ভাগ ভাগ হয়ে খুলে পড়বে। তবু সব আশংকাকে মিথ্যা প্রমাণিত করে এগুলো কিভাবে যেন পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে পড়ে।

যাত্রার শুরুতে এক স্থানীয় নারীর জন্য সিট ছেড়ে গাড়ির পিছনে ঝুলে পড়লাম। উদ্দেশ্যটা পরোপকার নয়, বরং গাড়িতে যদি শান্তিবাহিনী কোন চর থাকে তাকে বোঝানো যে আমরা তাদের শত্রু নই। তবে চান্দের গাড়িতে ঝুলে ঝুলে যাত্রা করার অভিজ্ঞতা হলো ভয়াবহ। বান্দবান-রুমার রাস্তা সে সময় ছিলো ভাঙ্গা এবং খানা-খন্দে ভরা। কিছু কিছু জায়গায় তো পিচ ঢালাই-ই ছিল না। তার ওপর রাস্তার দুই দিকে জ্বলছে জুমের আগুন। পাহাড়ে চৈত্র-বৈশাখ মাসে জুম চাষ শুরু করার আগে শুকনো ঝোপ-ঝাড়ে আগুন ধরিয়ে পাহাড়ের ঢাল পরিষ্কার করা হয়। এরপর মৌসুমের প্রথম বৃষ্টির পর জুম চাষ শুরু হয়।অদ্রি

প্রচণ্ড ঝাঁকুনি আর জুমের আগুনের প্রচণ্ড তাপে আমি যখন প্রায় শিক-কাবাব হয়ে গেছি তখন লক্ষ্য করে দেখি বন্ধু রিপন জনৈক মৌলবীর কাঁধে মাথা রেখে নিদ্রামগ্ন। ঘুমানোর এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে রিপনের, যে কোন জায়গায় সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও ঘুমাতে পারে। এদিকে গাড়ির প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেয়ে রেজার পুরোনো হাঁটুর ব্যথাটা নাকি সেরে গেছে। তিনজনে মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম এখান থেকে বেঁচে ফিরতে পারলে ঢাকার সকল বাতের রোগীকে বান্দরবানে এসে চান্দের গাড়িতে চড়ার জন্য প্রচারণা চালাবো।

বিকাল সাড়ে তিনটায় কাইক্ষং ঝিরি ঘাটে চাঁদের গাড়ি আমাদের নামিয়ে দিলো। ৫-৬টা স্থায়ী দোকানের এই বাজারটা রুমার জীপ স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখান থেকে নৌকায় করে সাংগু নদী দিয়ে রুমা যেতে হবে। দুই ঘণ্টার পথ।

চন্দ্রযান থেকে অবতরণ করে নৌযানের সওয়ারী হলাম। সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। শুকনো মওসুম হওয়ায় সাংগু নদীর বেশিরভাগ জায়গাতেই তখন হাঁটু পানি। মাঝি জানালো, বর্ষাকালে এই নদীতে বোট (শ্যালো নৌকা) চলে। এরমধ্যে রেজা একটা সুসংবাদ দিলো; চাঁদের গাড়ির প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে ক্যামেরাটা ঠিক হয়ে গেছে। নৌকা চলা অবস্থাতেই আমরা পানিতে নেমে ছবি তোলা শুরু করলাম। সাংগু নদীর দুইপাড় অপূর্ব সুন্দর। দুই দিকে উঁচু উঁচু সব পাহাড়, নদীর তীরে তামাক, কুমড়া আর ভুট্টা ক্ষেত। জায়গায় জায়গায় পাথুরে পাহাড়ের গা ফেটে জল গড়িয়ে পড়ছে। ঢালে ঘন হয়ে জন্মেছে গাছপালা। সত্যি এতো সুন্দর জায়গা বাংলাদেশে আছে তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

এতো সৌন্দর্যের মাঝেও আমি দুশ্চিন্তায় আছি। নৌকায় উঠেছিলাম বিকাল পৌনে চারটায়। আস্তে আস্তে দিনের আলো কমে আসছে। চারিদিকের নির্জনতা, গাছপালা আর আকাশ ছোঁয়া পাহাড়; সবমিলে এক রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। মনে হচ্ছে, সত্যিই আমরা তিন বন্ধু এক অনিশ্চিত যাত্রায় বেরিয়েছি।

বিকেল সাড়ে পাঁচটায় রুমা বাজার ঘাটে নামলাম। পৌঁছে সবার আগে নামাজ পড়ে নিলাম। রুমার বর্তমান মসজিদটা তখনও ছিল, তবে আয়তনে ছিলো পাঁচ ভাগের একভাগ। এরপর হোটেলে বসে কিছু খেয়ে নিলাম, কারণ সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি। হোটেলেই পরিচয় হলো মাংস ব্যবসায়ী নাসিমের সাথে। আমাদের উদ্দেশ্য শুনে আশ্বস্ত করলো আমাদের জন্য সে গাইডের ব্যবস্থা করে দিতে পারবে। সবচেয়ে শান্তি পেলাম রুমার স্থানীয় লোকজনের মুখে এই সংবাদটা পেয়ে, নিরাপত্তার যে আশংকা আমাদের সারাটা দিন তাড়িয়ে বেরিয়েছে তা নিয়ে মাথা ব্যথার কোন কারণ নেই। শান্তিচুক্তির পর থেকেই রুমার পরিস্থিতি একেবারেই শান্ত। চুক্তি না হলে আমরা হয়তো রুমা পর্যন্তই আসতে পারতাম না। কাজেই তাজিডং পর্যন্ত যেতে কোন সমস্যা নেই।


সাংগু নদীর দৃশ্য (১৬ই এপ্রিল ১৯৯৮)


সারাদিন পরে (আরো ভালো করে বললে গত তিন মাসের মধ্যে) এই প্রথম ইতিবাচক সংবাদ শ্রবণে আমাদের উৎসাহ আরো বেড়ে গেল, খাওয়াটাও ভালো হল। নাসির আমাদের গাইড ঠিক করে দেবে বলে কথা দিল। তবে তার আগে রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্প থেকে অনুমতি নিতে হবে। ক্যাম্প কমান্ডার হোটেলেই ছিলেন, আরো একবার তাকে আমাদের ভ্রমণের উদ্দেশ্য খুলে বলতে হল। তিনি এবার সরু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জেরা শুরু করলেন। নাম-ঠিকানা, পেশা ইত্যাদি সকল বৃত্তান্ত জানার পর নিশ্চিত হলেন আমরা কোথাও কোন অপরাধ করতে যাচ্ছি না কিংবা কোথাও কোন অপরাধ করে আত্মগোপন করতে যাচ্ছি না।

হোটেল থেকে বের হয়ে পথের খবর নিলাম। রাস্তা মোটামুটি দুর্গম, এক থেকে দেড় দিনের পথ। পথে বেশকিছু পাহাড়ি গ্রাম পড়বে। কাজেই থাকা খাওয়ার চিন্তা করা লাগবে না। একটা মজার ব্যাপার হলো, যখনই আমরা তাজিডং পাহাড়ে যাওয়ার কথা বলছি ততবারই স্থানীয় লোকজন সেটাকে কেওক্রাডং (পাহাড়িদের ভাষায় কেওক্রাতং) বলছে। এতে আমাদের ধারণা হয়েছিল তাজিডং, কেওক্রাডং ও বিজয় একই পাহাড়। (পরবর্তীতে সুনসংপাড়া আর্মি ক্যাম্প থেকেও আমাদেরকে একই তথ্য দেওয়া হয়েছিল।) যাই হোক দুশ্চিন্তা ঝেড়ে আমরা তিন বন্ধু বান্দরবানের ঐ সরকারী কর্মকর্তার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করলাম। এরপর মাগরিবের নামাজ পড়ে আর্মি ক্যাম্পে গেলাম রিপোর্ট করতে।

রুমা আর্মি ক্যাম্পের কমান্ডার এক রহস্যময় চরিত্র। অনেক চেষ্টা করেও আমরা তার নাম জানতে পারলাম না। নাসির ইতিমধ্যেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে ফেলেছে। যেহেতু রুমায় কোন বোর্ডিং ছিলো না তাই ব্যবস্থা হয়েছে থানার কাছে সরকারী রেস্ট হাউজে। রুমা বাজার থেকে এই রেস্ট হাউজে যাওয়ার রাস্তাটা অত্যন্ত নির্জন এবং অন্ধকার ছিল। বর্তমানে টুরিস্টরা থানার সামনে লেকের পাড়ে যাত্রী ছাউনীতে যেখানে নাম রেজিস্ট্রি করে সেখান থেকেই এই রেস্ট হাউজসটা দেখা যায়। এখনকার ট্রেকার বা টুরিস্টদের কল্পনাতেও আসবে না তখন এই জায়গাটা কতো সুন্দর ছিলো। কালের গর্ভে অনেক কিছুর মতো এই রেস্ট হাউজের আশে-পাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যটাও হারিয়ে গেছে।

নাসির তার ঠিক করা গাইড শাহাবুদ্দিনের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলো। শাহাবুদ্দিন আমাদেরকে রেস্ট হাউজ পর্যন্ত নিয়ে আসলো। রেস্ট হাউজের কেয়ারটেকার হচ্ছেন মাস্তান ভাই। তবে মাস্তান ভাই কোন একটা কাজে কয়েকদিনের জন্য বাইরে যাওয়ায় তার স্ত্রী আমাদেরকে থাকার ঘর দেখিয়ে দিলেন। রাতের খাবারের কথা জিজ্ঞেস করাতে, ভাবী (মাস্তান ভাইয়ের স্ত্রী) জানালেন ঘরে পর্যাপ্ত বাজার নেই। আগে থেকে বলা থাকলে ব্যবস্থা করা যেত। আশেপাশের কোন রেস্টুরেন্টও নেই যে খাব। এদিকে শাহাবুদ্দিন জানালো সন্ধ্যা ৭টার পর রুমা বাজারের সব দোকান বন্ধ হয়ে যায়। অগত্যা রেস্ট হাউজের সামনে একটা গর্ত করে সাথে করে আনা চাল-ডাল-তেল-মসল্লা দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে ফেললাম। লবন কম হলেও খেতে মন্দ ছিল না। অবশ্য ক্ষুধা পেটে সব খাবারই অমৃত লাগে।

সে সময়কার রুমা এবং রুমা বাজার সম্পর্কে কয়েকটা তথ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন। তা নাহলে বর্তমান যুগের ট্রেকাররা তখনকার পরিস্থিতি বুঝবেন না।

[১] রুমাতে থাকার জন্য (পর্যটকদের জন্য) শুধু থানা রেস্ট হাউজটাই ব্যবহার করা যেতো। পরবর্তীতে আমাদের অভিযান কাহিনী দৈনিক ভোরের কাগজে (তৎকালীন সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা) ছাপা হলে রুমাতে টুরিস্টদের আনাগোনা বেড়ে যায়। তখন উপজেলা রেস্ট হাউজটাও টুরিস্টদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

[২] রুমা বাজার থেকে থানা রেস্ট হাউজে আসতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগতো। পুরো পথটা ছিল ঘন গাছপালায় ঢাকা এবং অত্যন্ত নির্জন। রাতে টর্চলাইট ছাড়া চলাফেরা করা ছিল অসম্ভব।

[৩] পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতি ছিল উল্লেখ করার মতো। কোন রাজনৈতিক কলহও চোখে পড়েনি।

[৪] রুমা বাজারের কোন দোকানে আমাদের কাছ থেকে কোন জিনিসের দাম বেশি রাখেনি।

[৫] রুমা বাজারের এখনকার ব্যাপ্তি এবং দোকানের সংখ্যা ছিল বর্তমানের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। বাজারের কোন পাকা দালান ছিল না।

[৬] বাজারে তখন পণ্য বিনিময় প্রথাও (বার্টার) চালু ছিল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাহাড়ের স্থানীয়রা নিজেদের মধ্যে এটা করতো। বাঙালিরা সাধারণত বার্টার পদ্ধতিতে ব্যবসা করতো না। করলেও সেক্ষেত্রে পাহাড়িরা অনেক ঠকে যেত।

[৭] থানা রেস্ট হাউজে তখনও বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। পাশেই অবস্থিত থানায় জেনারেটরের ব্যবস্থা ছিল। প্রয়োজন হলে মাঝে মধ্যে তারা জেনারেটর চালাতো।

[৮] তখনকার রুমাতে সুযোগ-সুবিধা যতই কম থাকুক সেখানের মানুষ খুব শান্তিতে বসবাস করতো। চুরি-ডাকাতি বা অন্যান্য অপরাধ খুবই কম হত।

ভোর সাড়ে চারটায় ঘুম থেকে উঠে আবিস্কার করলাম আমরা অপূর্ব সুন্দর একটি রেস্টহাউজে রাত কাটিয়েছি। দোতলা রেস্ট হাউজটির তিনদিকে একটা লেক পরিখার মতো ঘিরে রয়েছে। কাছের পাহাড়ের উপর অমাবস্যা তিথির ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ আর হালকা কুয়াশা অপরূপ দৃশ্যের অবতারণা করেছে। চাঁদের পাশে উজ্জ্বল বৃহস্পতি আর শুক্র গ্রহ (শুকতারা) প্রকৃতির সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এত সুন্দর দৃশ্য একলা উপভোগ করা যায় না। তাই তাড়াতাড়ি রেজা আর রিপনকে ঘুম থেকে ডেকে তুললাম। তখনও চারিদিক অন্ধকার। দোতলার বারান্দায় এসে ওরা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো। এর কিছুক্ষণ পর আমরা তিনজন তর্কে লিপ্ত হলাম ভবিষ্যতে বিয়ের পর কার আগে কে এখানে হানিমুন করতে আসবো সেটা নিয়ে। তর্ক করতে করতেই হঠাৎ চোখ গেলো ঘড়ির দিকে। পাঁচটা বেজে গেছে। এরপর আমাদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল।

নাসির ভোর পাঁচটায় গাইড নিয়ে বাজারে থাকবে বলে কথা দিয়েছিল। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে রুমা বাজারে উপস্থিত হলাম। আগেরদিন রাতেই গাইড শাহাবুদ্দিন বলে দিয়েছিল আমাদের সাথে আনা চাল, ডাল, তেল, মসলাগুলো সাথে নেওয়ার দরকার নেই। পথেই অনেক গ্রাম(পাড়া) পড়বে। সেখানেই রান্না-খাওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে। তাই আমরা রান্নার সকল সরঞ্জাম মাস্তান ভাইয়ের স্ত্রীর হেফাজতে দিয়ে আসলাম। সঙ্গে নিলাম শুধু বিস্কুট, ক্যান্ডি, চিড়া আর চিনি।

সকাল ছয়টায় রুমা বাজারে উপস্থিত হয়ে নাস্তা সেরে নিলাম। নাস্তা খেতে খেতেই নাসির গাইড শাহাবুদ্দিনকে নিয়ে উপস্থিত হল। এখানে শাহাবুদ্দিন সম্পর্কে কয়েকটা তথ্য দিয়ে রাখি। সে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার লোক। কসাইদের জন্য পাহাড়ি গ্রামগুলো থেকে গরু আর গয়াল (পাহাড়ী বুনো গরু) নিয়ে আসে। এজন্য সে দিন প্রতি ১০০ টাকা মজুরি পায়। পাহাড় এবং পাহাড়ী পথ সম্পর্কে ভাল ধারণা আছে তার। তবে কথা একটু বেশি বলে।

রওনা দেয়ার আগে আবার আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হল। এখানেই দেখা হল আরেক দল অভিযাত্রীর সাথে। তারা দাবী করলো কেওক্রাডং থেকেই তারা ফিরেছে। ছবি তোলা হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করাতে তারা জানালো ডাকাতির ভয়ে সাথে ক্যামেরা নেয়নি তারা। যাওয়ার সময় আর্মি ক্যাম্পেও রিপোর্ট করেনি। বুঝলাম কেওক্রাডং চূড়ায় গিয়ে থাকলেও তাদের হাতে বিশ্বাসযোগ্য কোন প্রমাণ নেই। তবে অভিযাত্রীরা তাদের সদ্যলব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে বেশ কিছু টিপস দিলো যা পরবর্তীতে আমাদের অনেক কাজে আসে। থানা রেস্ট হাউজের কেয়ারটেকার মাস্তান ভাই এই দলের গাইড ছিলেন। এতক্ষণে পরিষ্কার হলো মাস্তান ভাই গত দুইদিন কোথায় ছিলেন।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সকাল সাতটা বিশ মিনিটে আমরা রওনা দিলাম। এরই মধ্যে স্থানীয়দের পরামর্শে পায়ের বুট জুতা খুলে রুমা বাজার থেকে কেনা একজোড়া পাম সু ধরনের জুতা পরে নিলাম। পথ চলা শুরু হতেই বুঝলাম আমাদের গাইড শাহাবুদ্দিন একটা চলন্ত টেপ-রেকর্ডার। এর ব্যাটারি কখনও শেষ হয় না। আমরা জুতা পরলেও শাহাবুদ্দিনকে দেখলাম খালি পায়েই রওনা দিয়েছে। এই পাথুরে ঝিরি আর পাহাড়ি পথ সে কিভাবে খালি পায়ে দিনের পর দিন পাড়ি দেয় তা পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য।

যাত্রার শুরুতেই সে [শাহাবুদ্দিন] তার ননস্টপ টেপরেকর্ডার চালু করে দিলো। এই এলাকার আনারসের ফলন কেমন হয়, কবে থেকে শুরু করে, কোন গ্রামে গেলে সুন্দরী পাহাড়ি তরুণীদের সাথে ছবি তোলার সুযোগ পাওয়া যাবে, সব বিষয়েই সে অগাধ জ্ঞান রাখে। তার অনর্গল বকবকানিতে রেজা আর রিপন বিরক্তি প্রকাশ করতেই সে তার বকবকানি আরও বাড়িয়ে দিলো।

যাত্রার প্রথম পর্বটা ছিল অপেক্ষাকৃত কম কষ্টকর। প্রায় ৬০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের উপর অবস্থিত লাইরুনপি পাড়া পার হয়ে রুমা খালে নামলাম। শাহাবুদ্দিন এরই মধ্যে আমার স্পোর্টস গগলসটার দখল নিয়ে নিয়েছে। এ ধরনের রঙ্গিন চশমা সে জীবনে প্রথম দেখেছে (পরবর্তীতে অভিযান শেষ হওয়ার পর সানগ্লাসটা শাহাবুদ্দিনকে উপহার দিয়ে দেই)।

মাঝখানে আঁকাবাঁকা রুমা খাল ও তার পাথুরে অববাহিকা; আর তার দুপাশে উঁচু উঁচু সব পাহাড়। বাংলাদেশের এমন রূপ আমরা কখনও দেখিনি। পথেই পেয়ে গেলাম এক ত্রিপুরা পরিবার। পথের ধারে জুম চাষের ফাঁকে খেয়ে নিচ্ছে। মেন্যু হচ্ছে পাহাড়ি ঢেঁকি ছাঁটা লাল চালের ভাত, সঙ্গে শুধু লবন আর মরিচ। খাওয়া হচ্ছে কলাপাতার পাতে। পরিবারটির সাথে কয়েকটা ছবি তুলে আবার হাঁটা ধরলাম। চারপাশের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে দেখতে আমাদের আর তৃষ্ণা মেটে না।

রুমা ঝিরির দুই ধারে ভুট্টা আর তামাক ক্ষেত। যতদূর চোখ যায় উঁচু উঁচু পাহাড়। দূরের পাহাড়গুলো কালচে সবুজ রঙের দেখাচ্ছে। ঘণ্টা দুয়েক হাঁটার পর একটা মারমা গ্রাম পেলাম, নাম বগামুখ পাড়া। মারমারা সাধারণত নদী বা ঝিরিপথের ধারে তাদের আবাস গড়ে। ধর্মে বৌদ্ধ।

বগামুখ পাড়ায় বিশ মিনিটের একটা যাত্রা বিরতি দিয়ে বিস্কুট, চা, পানি, খেয়ে নিলাম। কিছু ছবি তুললাম। বগামুখ পাড়া আসলে একটা জাংশন। এখান থেকে একটা রাস্তা উঠে গেছে সাইকৎ পাড়ার দিকে। আরেকটা রাস্তা ঝিরিপথ ধরে আরও একটু এগিয়ে বগামুখ ঝর্ণার পাশ দিয়ে বগালেকের দিকে গেছে। ২য় পথটা অপেক্ষাকৃত সহজ হলেও আমাদের তা জানার কথা না। আমাদের এই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে গাইড শাহাবুদ্দিন সাইকৎ পাড়ার রাস্তা ধরলো। কারণ অত্যন্ত কষ্টকর এই ট্রেইলটা কেওক্রাডংয়ে যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা।অদ্রি


রুমা খালে ট্রেকিং; বাঁ-দিক থেকে রেজা এবং আমি (১৭ই এপ্রিল, ১৯৯৮)


শাহাবুদ্দিনের পিছে পিছে আমরা পাহাড়ে ওঠা শুরু করলাম। রাস্তা প্রায় ৬০-৭০ ডিগ্রি খাড়া। ইতিমধ্যে সূর্য মাথার উপর অনেকটা তেঁতে উঠেছে। তার উপর চারিদিকে জুমের আগুনে পোড়া পাহাড় ঢালে এক টুকরো ছায়া নেই। ৩০০-৪০০ ফুট উঠতেই আমাদের অবস্থা কাহিল। থেমে পড়তেই শাহাবুদ্দিন জানালো সামনে একটা ঝর্ণা আছে, সেখানে গিয়ে পানি খেয়ে বিশ্রাম করা যাবে।

আবার ওঠা শুরু করলাম। শাহাবুদ্দিনের একটু রাস্তা আর শেষ হয় না। উপরের দিকে তাকিয়ে মনে হয় ঐ তো। আর ৫০ ফুট উঠলেই পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে যাব। ৫০ ফুট কোন রকমে উঠার পর দেখা গেল কোথায় চূড়া। আরও ১০০ ফুট উঠতে হবে। ঐ ১০০ ফুট ওঠার পরেও চূড়ার দেখা পাওয়া যায় না। রিপন এর নাম দিলো ‘পাহাড়ি মরীচিকা’।

পাহাড়ের মাঝামাঝি উঠার পর ঝর্ণার দেখা পেলাম। খুব বেশি হলে আধ ঘণ্টার মতো পাহাড় বাওয়া হয়েছে। তাতেই আমাদের কাহিল অবস্থা। ঝর্ণার পাড়েই তিনজন লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লাম। কয়েক মিনিট বিশ্রামের পর সাথের ঝোলা থেকে গ্লুকোজ আর স্যালাইন মিশিয়ে খাওয়ার পর মনে হল আবার নতুন জীবন পেলাম। শাহাবুদ্দিনের বুদ্ধিতে মাথা আর ক্যাপ ভিজিয়ে নিলাম। এ পদ্ধতিতে গরম কিছুটা কম লাগলো।

এরপর আবার পাহাড়ে উঠা শুরু হল। আরও ২০-৩০ মিনিট পর পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছলাম। ২০০০ সালে আমি এই পাহাড়টার নামকরণ করেছিলাম ‘রাসেল পাহাড়’। আমার অনেক অভিযানের সঙ্গী গোলাম রসূল রাসেলের নামে। বর্তমানে সে কানাডা প্রবাসী।অদ্রি

রাসেল পাহাড় পার হয়ে একই রকম আরও দুইটা পাহাড় পার হতে হল। এরপর দেখা পেলাম বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু বসতি সাইকৎ পাড়ার। বাঙালিদের কাছে যার পরিচিতি সৈকত পাড়া নামেও। ঘড়িতে তখন বাজে বারটা, আর আমাদের অবস্থাও বারোটা।

গাইড শাহাবুদ্দিন পাড়ার এক বাড়িতে আমাদের দুপুরের খাওয়া এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা করলো। ১৯৯৮ সালে সাইকৎ পাড়ায় মাত্র আট/দশ ঘর লোকের বাস ছিল। আশেপাশের পাহাড়ি গ্রামগুলোর মধ্যে এরাই সবচেয়ে ধনী ছিল। এই পাড়ার সবাই বম জাতি এবং খ্রিস্টান ধর্মালম্বী।

গোসল সেরে এসে দেখলাম শাহাবুদ্দিন খাওয়ার আয়োজন করেছে। সে জানালো এখানে তরকারি তেমন কিছু পাওয়া যাবে না। একটা মুরগী কিনলে খাওয়াটা ভাল হবে। কিন্তু এই দুর্গম এলাকায় মুরগীর দাম ঢাকার থেকেও বেশি। আবার আমাদের বাজেটও অল্প। তাই শাহাবুদ্দিনকে বললাম আলু-টালু দিয়ে কিছু একটা ব্যবস্থা করতে। পরে অবশ্য বুঝেছিলাম মুরগীর প্রতি শাহাবুদ্দিনের আলাদা একটা আকর্ষণ আছে। কারণ এর পরে আমরা যে গ্রামেই থেমেছিলাম সে আমাদের কাছ থেকে মুরগীর পয়সা খসানোর জন্য চেষ্টার কোন ত্রুটি করেনি। কিন্তু আমাদেরও আপোষহীন অবস্থানের কারণে তার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।


আমাদের কেওক্রাডং সামিটের দিন; সুসাং পাড়া আর্মি ক্যাম্পের পাশ ঘেষে নতুন পাড়া নামক একটা ত্রিপুরা গ্রাম ছিল। ২০০৪ সালে সুংসনপাড়া গিয়ে এই গ্রামটা আর দেখিনি। পরে জেনেছি, নিরাপত্তার কারণে সেনাবাহিনী এই গ্রামটা অন্য কোথাও সরিয়ে নিয়েছিল।


যাই হোক, শাহাবুদ্দিন বেরিয়ে গিয়ে কোথেকে যেন কিছু আলু টালু নিয়ে আসে। কুটা বাছা শেষ করে আবার সে উদয় হল। এবার তার দরকার তেল। কিন্তু এবারও তাকে নিরাশ হতে হল। কারণ আমরা আমাদের রান্নার সকল তেল-মসলা রুমা রেস্ট হাউসে রেখে এসেছি। অগত্যা বেচরা পাহাড়ি ধানী মরিচ দিয়ে আলুর কি একটা ঘোড়ার ডিম রান্না করল। সাথে পাহাড়ি ঢেঁকি ছাঁটা লাল চালের ভাত। খেতে বসে প্রচণ্ড ঝালে আমাদের চোখের জল আর নাকের জল এক হয়ে গেল। আমাদের দুরাবস্থা দেখে শাহাবুদ্দিন দাঁত কেলিয়ে জানাল, এখানকার লোকেরা ম্যালেরিয়ার ভয়ে বেশি বেশি ঝাল খায়। কারণ বেশি ঝালে ম্যালেরিয়া কাছে ভিড়তে পারে না। (ইতিমধ্যেই সে আধ কেজি চালের ভাত সাবাড় করে ফেলেছে।) আমরা তাকে আশ্বস্ত করলাম ঔষধ আমাদের সাথেই আছে। তাকে আর কষ্ট করে ঝাল দিয়ে ম্যালেরিয়া তাড়াতে হবে না।

খাওয়ার পর গেরস্থের স্ত্রী আমাদের জন্য দুধ ছাড়া কফি নিয়ে আসলেন। এই কফি তারা পাহাড়েই চাষ করে থাকে। কফি খাওয়ার পর সবাই বাঁশের মেঝেতে সটান শুয়ে একটা ঘুম দিলাম।

ঘণ্টাখানেক ঘুমানোর পর একটা নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম (সৃষ্টিকর্তা কেন যেন কিছু বিব্রতকর অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য শুরুতেই আমাকে বেছে নেন)। ঘুম থেকে উঠে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য এদিক ওদিক খুঁজেও কোন শৌচাগার পেলাম না। বুঝলাম শৌচাগার ব্যবহারে অভ্যাস পাহাড়িদের নেই। বাংলাদেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে তখনও শৌচাগারের অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। সেক্ষেত্রে ওইসব অঞ্চলের ঝোপ-জঙ্গল বা জমির আইল মাড়ানোর সময় সাবধানে পা ফেলতে হয়। অসাবধানে কিসের উপর পা পড়ে যায়, বলা যায় না। কিন্তু শৌচাগার না থাকা সত্ত্বেও সাইকৎ পাড়ার আশেপাশের ঝোপ-ঝাড় এতো পরিষ্কার কেন বুঝতে পারছিলাম না।অদ্রি

জবাবটা পেলাম একটু পরেই। আমাকে একা জঙ্গলের দিকে দৌড়াতে দেখে কয়েকটা ‘লেন্ডি’ আমার পিছু নিয়েছিল। পাহাড়ের প্রতেকটা পাড়াতেই কুকুর আর শুকর পালন করা হয়। এদেরই আমরা লেন্ডি নামে ডাকি।
জঙ্গলের আড়ালে যখন প্রাকৃতিক কর্মটি সম্পাদন করছি, কয়েকটা  লেন্ডি তখন গভীর দৃষ্টিতে আমাকে পর্যবেক্ষণ করছে। এই পরিস্থিতিতে কিছুটা ভয় কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে কাজ শেষ করে মাত্র রওনা দিয়েছি, এমন সময় পিছনে লেন্ডিদের চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ পেলাম। পিছনে তাকিয়ে দেখি আমার ত্যাগকৃত কর্মকাণ্ড নিয়ে লেন্ডিদের মাঝে কাড়াকাড়ি। যেন তাদের পোলাও-কোর্মা খেতে দেওয়া হয়েছে।

কোন মতে বমি আটকে ফিরে এসে রেজা-রিপনকে সব খুলে বললাম। এবার রিপন চললো বাঁশ নিয়ে, যাতে সে নির্বিঘ্নে কাজ সারতে পারে। এদিকে লেন্ডিরা রিপনকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে রেজার কাজ সারতে তেমন বেগ পেতে হয়নি।

প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার পর্ব শেষ করে এসে দেখলাম রওনা দেওয়ার জন্য শাহাবুদ্দিন তৈরি হয়ে বসে আছে। এবার আমাদের গন্তব্য দার্জিলিং পাড়া। যাওয়ার আগে আমরা খাওয়া বাবদ গেরস্থকে কিছু টাকা দেওয়ার জন্য তাকে ডাকতে বললাম। কিন্তু শাহাবুদ্দিন কিছুতেই গেরস্থকে ডাকতে রাজি হল না। সে বললো, টাকা দেওয়া লাগবে না। তার আচরণ আমাদের কাছে খুব আশ্চর্য মনে হল। পরে বুঝেছিলাম, ঘরের অতিথিকে আপ্যায়ন করে তার কাছ থেকে বিনিময় নেওয়ার অভ্যাস পাহাড়িদের মাঝে নেই।

বিকাল ৪টায় আবার পথ চলা শুরু হল। এবার পথ কিছুটা সহজতর। পথে পড়ল পাহাড়ের গা জুরে বিস্তীর্ণ জুম ক্ষেত। জুমের জন্য পাহাড়ের গা পুড়িয়ে ফেলার কারণে মনে হচ্ছিল আমরা যেন কোন জীবন্ত আগ্নেয়গিরির গা ধরে হেঁটে যাচ্ছি, যেখানে কিছুদিন আগেই অগ্নুৎপাত হয়েছে। দূরের পাহাড়গুলো যেন একটার গায়ে আরেকটা হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। যারা এসব দৃশ্য দেখেনি তারা কল্পনাও করতে পারবে না সে কি জিনিস। স্বপ্নও এতো সুন্দর হয় না, আমরা বাস্তবে যা দেখেছি।


কেওক্রাডংয়ের চূড়ার পাশে হেলিপ্যাড


বিকাল পাঁচটায় আমরা একটা তিন রাস্তার মাথায় এসে পৌঁছলাম। এর একটা রাস্তা গেছে দার্জিলিং পাড়া, একটা গেছে বগালেক আর আরেকটা আমরা যেদিক দিয়ে আসলাম, অর্থাৎ সাইকৎ পাড়ার দিকে। গত ১০ই ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে কেওক্রাডং যাওয়ার পথে এই তিন রাস্তার মাথাটা খুঁজে পাইনি। সাইকৎ পাড়ায় যেতে এখন হারমন পাড়ার রাস্তা ব্যবহার করা হয়। ১৯৯৮ সালে হারমন পাড়ার অস্তিত্ব ছিল না। আমি সাইকৎ পাড়ায় যাওয়ার এই পুরোনো রাস্তাটা সর্বশেষ ব্যবহার করেছিলাম ২০০৭ সালে। এখন এই রাস্তাটা আর খুঁজে পাওয়া যায় না; যেন এর অস্তিত্বই কখনও ছিল না।

এই তিন রাস্তার মাথায় এসে কাঁধে বন্দুক ওয়ালা এক পাহাড়ি শিকারীর দেখা পেলাম। শাহাবুদ্দিন তার সাথে কুশল বিনিময় করলো। এরপর আমাদের জানালো এই শিকারি একসময় শান্তি বাহিনীর সদস্য ছিল। শান্তি চুক্তির পর এখন ভদ্র হয়েছেন।

বিকাল সাড়ে পাঁচটায় দার্জিলিং পাড়ার প্রবেশমুখে এসে পৌঁছলাম। এখানেই দেখা হল দুই অপূর্ব সুন্দরী বম তরুণীর সাথে। শাহাবুদ্দিনের হঠাৎ মনে পড়ে গেল সে আমাদের সকালে কথা দিয়েছিল সুন্দরী পাহাড়ি মেয়েদের সাথে আমাদের ছবি তোলার ব্যবস্থা করে দেবে। সে তার কথা রাখার জন্য উঠে পড়ে লাগলো। কিন্তু অনেক জোরাজুরি করেও শাহাবুদ্দিন তাদেরকে ছবি তুলতে রাজি করাতে পারলো না পরে রেজা আর রিপন তাকে একাজ থেকে নিবৃত করে।অদ্রি

দার্জিলিং পাড়ার হেডম্যান সাংছিম কারবারির বাড়িতে আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হল। আমরা গেলাম ঝর্ণার পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হতে। হাত-মুখ ধুতে এসে সাংছিম কারবারীর বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারলাম না। ঝর্ণা থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে সে পানি নিয়ে এসেছে গ্রামের মধ্যে। পানি ধরে রাখার জন্য সে একটা হাউজও নির্মাণ করেছে। বগালেকসহ রুমার অনেক গ্রামেই এখন এই পদ্ধতিতে ঝর্ণা থেকে গ্রামে পানি আনার ব্যবস্থা রয়েছে।

আমি অজু করে নামাজ পড়ে নিলাম। শেষ বিকেলের ম্লান আলোতে সাংছিম আমাদেরকে কেওক্রাডংয়ের চূড়া দেখালো। কেওক্রাডং দেখে আমাদের উৎসাহ আরো বেড়ে গেল। সময় থাকলে তখনই রওয়ানা দিতাম। আপাতত ইচ্ছেটাকে একরাতের জন্য ঘুম পাড়িয়ে আমরা ত্রিরত্ন পাহাড়ের কিনারায় বসে আড্ডায় মেতে উঠলাম। এই ফাঁকে প্রায় ২৫০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত দার্জিলিং পাড়ার তখনকার অবস্থা সম্পর্কে একটু ধারণা দেই:

[১] দার্জিলিং পাড়ায় তখন মোট ১৩-১৪ ঘর মানুষের বাস ছিল।

[২] রাতে খাওয়ার জন্য মুরগীর ডিম খুঁজতে পাঠিয়েছিলাম শাহাবুদ্দিনকে। সে পুরো গ্রাম ঘুরে মাত্র একটা ডিম পেয়েছিল। তাও দাম ছিল দশ টাকা। সেসময় ঢাকায় মুরগীর ডিমের হালি ছিল ১১-১২ টাকা।

[৩] তাদের একমাত্র জীবিকা ছিল জুম চাষ।

[৪] বমদের নিজেদের আলাদা ভাষা থাকলেও লেখালেখির জন্য এরা ইংরেজি অক্ষর ব্যবহার করে এই তথ্যটা প্রথম জানলাম দার্জিলিং পাড়ায় এসে।

সন্ধ্যার পর রিপনের বম ভাষা শিক্ষা পর্ব শুরু হল। শিক্ষক সাংছিম কারবারী নিজে। সাংছিমের ৫-৬ টা ছেলেমেয়ে। (২০১৫ সালে সাংছিমের এক মেয়ে, নবীয়ালের সাথে দেখা হয় বান্দরবান শহরে আমার খালাতো ভাই মুকিতের বাসায়। সে তখন বান্দরবান সরকারী কলেজে এইচএসসি পড়ে। তার আধুনিক শিক্ষা আর সাজ পোশাক দেখে অবাক হই আর ভাবি এই কি সেই সাংছিম কারবারীর মেয়ে, যাকে ১৯৯৮ সালে মায়ের কোলে একটা কুড়ে ঘরে দেখেছিলাম। সত্যিই, পর্যটন শিল্প একটা অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থা কতটা পাল্টে দিতে পারে তা না দেখলে বোঝা যায় না।) প্রায় ঘন্টা খানেক ভাষা শিক্ষা পর্ব শেষ করে আমরা রাতের খাবার খেতে বসলাম। মেন্যু লাল চালের ভাত আর পাহাড়ি কচুর ঝাল তরকারী।

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমুতে গেলাম। আমরা সাথে করে একটা স্লিপিং ব্যাগ নিয়ে এসেছিলাম। আর সাংছিম তার ঘরে রাখা বেশ কিছু কম্বল দিলো। সমুদ্র সমতল থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত বলে রাতে এখানে প্রচণ্ড শীত পড়ে। এতো কম্বল থাকা সত্ত্বেও ঠাণ্ডার চোটে রাতে ঘুমুতে পারলাম না।

ভোর তিনটার দিকেই পাহাড়ি গ্রামগুলো জেগে ওঠে। এরপর সামান্য কিছু মুখে দিয়ে তারা জুমে যায়। আমরা ভোর সাড়ে চারটায় উঠে কেওক্রাডং যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। সাথে আনা চিড়া ভিজিয়ে চিনি দিয়ে খেয়ে নিলাম। রওনা দেয়ার আগে শাহাবুদ্দিনের পাল্লায় পড়ে রেজা আর রিপন কিছু ব্যোম তরুণীর সাথে ছবি তুলে বাধ্য হল।

অবশেষে শাহাবুদ্দিন তার দেয়া কথা রাখতে পারলো, এক্ষেত্রে ফটোগ্রাফার ছিলাম আমি। কিন্তু পরে দেখা গেলো ক্যামেরার যান্ত্রিক গোলযোগে ছবিগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এ নিয়ে রেজা আর রিপনের আফসোসের শেষ ছিল না।

রওনা দিতে দিতে পৌনে সাতটা বেজে গেল। এবার শুধু উপরে ওঠা। চল্লিশ মিনিট পর আমরা সাতটা পঁচিশ মিনিটে কেওক্রাডং শীর্ষে উঠলাম। চূড়ার উপরে একটা ফলক বসানো, তাতে লেখা-

KEOKRADANG
THE HIGHEST PEAK (3172 ft.) OF
BANGLADESH

ফলকটি ১৯৯৩ সালের আগস্ট মাসে মেজর মোশাররফ হোসেন স্থাপন করেছিলেন। এই তথ্যগুলোতে আমরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম। এটা যদি কেওক্রাডং হয় তাহলে তাজিংডং কোনটা। আমরা তো তাজিংডং চূড়া স্পর্শ করতে এসেছি। পাশেই আরেকটা পাহাড়ের চূড়ায় একটা হেলিপ্যাড আছে। শাহাবুদ্দিন জানালো এই হেলিপ্যাডটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য বানানো হয়েছিল। গত ছাব্বিশে মার্চ তাঁরই এই চূড়াটা উদ্বোধন করার কথা ছিল। তার কথা শুনে আমরা হেলিপ্যাডের কয়েকটা ছবি তুললাম। কিন্তু কেন যেন মন ভরছে না।


কেওক্রাডংয়ে চূড়ায়। বাঁ-দিক থেকে রেজা, আমি এবং রিপন। এই ফলকটি এখনও আছে, তবে স্থানান্তরিত হয়ে চূড়ার পূর্ব পাশে আছে।


প্রায় এক হাজার ফুট নিচে একটা গ্রামের হালকা অবয়ব দেখা যাচ্ছে। শাহাবুদ্দিন জানালো ঐ গ্রামটার নাম সুসাং পাড়া, ওখানে একটা আর্মি ক্যাম্পও আছে। তিনজনে মিলে তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম সুসাং পাড়া আর্মি ক্যাম্পে যাব তথ্য নিশ্চিত হওয়ার জন্য। আমরা আসলে কোন পাহাড়ে উঠেছি? এটাই কি বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় ‘বিজয়’ কি না?

সুসাং পাড়া যেতে যেতে কেওক্রাডংয়ের তখনকার অবস্থা কিছুটা বর্ণনা করি।

[১] কেওক্রাডংয়ের ফলকটি এখনও আছে। তবে আগের অবস্থানে নেই।

[২] তখন কেওক্রাডংয়ে জুম চাষ হতো। আমরা যে সময় যাই তখন মাত্র পাহাড়টিকে জুম চাষের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। তাই আমরা সেখানে কোন বাঁশ ঝাড় বা গাছপালা পাইনি।

[৩] চূড়ায় ওঠার জন্য বা হেলিপ্যাডে ওঠার জন্য কোন সিড়ি ছিল না।

[৪] তখনও পাসিংপাড়া বা হারমন পাড়ার জন্ম হয়নি।

[৫] কেওক্রাডং চূড়ার পাশে রাস্তার উপর কোন সংকেতও ছিল না যেটা দেখে কেউ বুঝতে পারবে যে কেওক্রাডংয়ে পৌঁছে গেছে। আমাদের অভিযান কাহিনী দৈনিক ভোরের কাগজে ছাপা হওয়ার পর অনেক অভিযাত্রী কেওক্রাডং সামিট করে। তখন স্থানীয় গ্রামবাসীরা চূড়ার পাশে বাঁশের একটা মার্কিং রাখে। কারণ তখন কেওক্রাডং সারাবছর বাঁশছাড় আর জঙ্গলে পরিপূর্ণ থাকতো। সম্ভবত ২০০১-০২ সালের দিকে চূড়ায় ওঠার জন্য রাস্তা থেকে পাকা সিড়ি তৈরি করা হয়।

আবার সুসাং পাড়ার কথায় ফিরে আসি। কেওক্রাডং থেকে সুসাং পাড়ায় যেতে হলে খাড়া রাস্তায় প্রায় এক হাজার ফিট নামতে হয়। সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। খাড়া রাস্তাটা প্রায় ৭০ ডিগ্রি খাড়া। কোন কোন জায়গায় সেটা আশি ডিগ্রি পর্যন্ত। এই রাস্তা পাড়ি দিতে গিয়ে আমার বাঁ পায়ের হাঁটুতে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। বাঁ পায়ে বলতে গেলে কোন ভরই দিতে পারছিলাম না। এরপর পুরো অভিযান আমি শেষ করেছি শুধুমাত্র ডান পা আর বাঁশের লাঠির উপর ভর করে।এই ব্যথা সারতে দশ দিন সময় লেগে যায়।

অনেক কষ্টে সকাল দশটায় সুসাং পাড়া বাজারে পৌঁছাই। এখানে বম, মারমা, মুরং ও ত্রিপুরা এই চারটি জাতির বাস। বাজারেই আমরা সেনা সদস্যদের দেখা পেলাম। তারা আমাদের দেখে রীতিমতো বিস্মিত। শখ করে, এতো কষ্ট সহ্য করে কেউ এই এলাকায় বেড়াতে আসতে পারে তা তাদের কল্পনার বাইরে ছিল।


সুনসংপাড়া আর্মি ক্যাম্পের সামনে হেলিপ্যাডে রিপন ও আমি


এদিকে রিপন আর শাহাবুদ্দিন ক্যারাম খেলায় মেতে উঠল। রিপনের কাছে গো হারা হেরে অতি উৎসাহী শাহাবুদ্দিন এবার দাবা নিয়ে আসলো। কিন্তু আমরা তাকে পাত্তা না দিয়ে আর্মি ক্যাম্পের দিকে রওনা দিলাম। আর্মি ক্যাম্পে গিয়ে আরেকটা নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম। ক্যাম্পের সেন্ট্রি পোস্টে দেখলাম ১৪-১৫ বছরের এক কিশোরকে ঘিরে পাঁচ-ছয় জন সেনা সদস্যের একটা জটলা। সাথে একজন স্থানীয় গ্রামবাসীও আছে। জিজ্ঞেস করতে সেনা সদস্যরা জানালো এই কিশোর বার্মার বিদ্রোহী এক বাহিনীর সদস্য। সে মাসে দুইবার বা একবার সুসাং পাড়া বাজারে আসে তার বাহিনীর প্রয়োজনীয় রসদ-পত্র কিনতে। যেহেতু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে এদের কোন শত্রুতা নেই তাই সেনারাও এদেরকে ঘাঁটায় না। শুধু কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়। ছেলেটার সাথে আমরা একটা ছবি তুললাম। এরপর সেনারা স্থানীয় দোভাষীর মাধ্যমে ছেলেটার কাছ থেকে কিছু তথ্য নিয়ে এবং কয়েক প্যাকেট হাই প্রোটিন বিস্কুট উপহার দিয়ে ছেড়ে দেয়।

বেলা এগারটার দিকে ক্যাম্প কমান্ডার মেজর ওবায়দুল হক চৌকিতে এসে আমাদের সাথে দেখা করেন। আমি ভোরের কাগজের‘অবসর’ ম্যাগাজিনটা  আমি সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম, প্রকাশিত আদিত্য কবিরের ‘আমি বিজয় দেখিনি’ আর্টিকেলটা বের করে দেখালাম। মেজর সাহেব পত্রিকাটা দেখে আমাদের নিশ্চিত করলেন, আমরা বিজয় অর্থাৎ কেওক্রাডংয়ে উঠেছি। এটাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া এবং এই চূড়াটাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধন করার কথা ছিল গত ছাব্বিশে মার্চ।

এরপর ক্যাম্প কমান্ডার আমাদেরকে দুপুরে খাওয়ার নিমন্ত্রণ জানিয়ে বিদায় নিলেন। একটু পর ক্যাম্পের ডাক্তার এসে আমার পায়ের ব্যথাটা পরীক্ষা করে ব্যথার জন্য একটা মলম আর দুটো ক্যাপসুল দিয়ে গেলেন। ঘড়িতে দেখলাম এখনও লাঞ্চের আগে আমাদের হাতে এক-দেড় ঘণ্টা সময় আছে। ঘুরতে বের হয়ে গেলাম। পরিচয় হল বাচ্চু ত্রিপুরা নামের এক স্থানীয় যুবকের সাথে। আর্মি ক্যাম্পের পাশেই তার গ্রাম নতুন পাড়া।


সুসাং পাড়া থেকে কেওক্রাডংয়ের পথে


এখানে বলি রাখি, ২০০৪ সালে আমি আবার যখন সুনসংপাড়া যাই তখন নতুন পাড়া গ্রামটি আর দেখিনি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ক্যাম্পের নিরাপত্তার স্বার্থে সেনাবাহিনী গ্রামটা অন্য কোথায় সরিয়ে নেয়।

বাচ্চু ত্রিপুরার সাথে তার গ্রাম ঘুরে বেশ কিছু ছবি তুললাম। ত্রিপুরাদের সম্পর্কেও কিছু তথ্য জানলাম।

[১] ত্রিপুরারা হিন্দু ধর্মালম্বী।

[২] এঁদের নিজস্ব ভাষা ত্রিপুরা।

[৩] বিবাহিত রমণীরা গলায় প্রচুর পরিমাণে পুঁতির মালা পরে।

[৪] রমণীরা কানে বড় বড় ছিদ্র করে বিশাল আকারের পিতল বা রূপার দুল পরে।

জোহরের নামাজ আর্মি ক্যাম্পেই পড়লাম। এরপর তারা আমাদের মুরগী, সবজি আর ডাল দিয়ে ভাত খেতে দিল। এতে শাহাবুদ্দিনের মুরগী খাওয়ার আফসোস মিটলো। দুপুর দেড়টায় আমরা সুসাং পাড়া আর্মি ক্যাম্প ত্যাগ করি। যাওয়ার সময় মেজর সাহেব আমাদের কয়েক প্যাকেট বিস্কুট দেয় যা পরবর্তীতে আমাদের খুব কাজে আসে।

এরপর শুরু হয় আবার সেই দুর্গম-গিরি-কান্তার পাড়ি দিয়ে কেওক্রাডং ওঠার পালা। আমার পায়ের ব্যথা তখনও কমেনি। শুধুমাত্র একটা পা আর লাঠির উপর ভর করে ৭০-৮০ ডিগ্রি ঢাল বেয়ে এক হাজার ফুট উপরে ওঠা যে কি অবর্ণনীয় কষ্ট তা যার অভিজ্ঞতা নেই তাকে বোঝানো যাবে না।

১৮ই এপ্রিল ১৯৯৮ তারিখ বিকাল ৩ টায় ২য় বারের মতো আমরা কেওক্রাডং সামিট করি। একই দিনে দার্জিলিং পাড়া থেকে এবং সুসাং পাড়া থেকে ২য় বার কেওক্রাডং ওঠাটা একটা বিরল অভিজ্ঞতা। আমরা মারুফ, রেজা, রিপন-প্রথম বারেই এই অভিজ্ঞতা নিলাম।

২য় বার কেওক্রাডং চূড়ায় উঠে কিছুক্ষণ চিল্লাচিল্লি করলাম (যদিও আমাদের সাফল্য দেখার জন্য গাইড শাহাবুদ্দিন ছাড়া আশেপাশে আর কেউ নেই)। এরপর জাতীয় পতাকা আর ব্যানার নিয়ে ছবি তুললাম। ঢাকা থেকেই ব্যানারটা তৈরি করে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের মনে তখন অন্যরকম অনুভূতি। কারণ স্থানীয় লোকজনের কাছে কাছেই আমরা জানতে পেরেছিলাম আমাদের আগে আর ৫টি অভিযাত্রী দল কেওক্রাডং ওঠার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে আদিত্য কবিরের দলও ছিল। তবে একথা ঠিক তাঁরা ব্যর্থ হয়েছিল বলেই আজকে আমরা সফল হয়েছি।


কেওক্রাডংয়ের চূড়ায়; বাম দিক থেকে গাইড শাহাবুদ্দিন, রিপন এবং আমি। তথ্য বিভ্রাট: সুনসংপাড়া আর্মি ক্যাম্প থেকে আমাদের জানানো হয়েছিলো কেওক্রাডং, বিজয় এবং তাজিংডং একই পাহাড়ের ভিন্ন ভিন্ন নাম। ফলে ভুলবশত ‘তাজিংডং’ লেখা ব্যানার নিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল।


লাফালাফি, চিল্লা-চিল্লি আর ছবি তোলার পর আমাদের আর কোন কাজ নেই। কাজেই বিকাল সাড়ে ৩ টায় আমরা বগা লেকের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ৪টা ১৫মিনিটে দার্জিলিং পাড়া থেকে আমাদের জিনিসপত্রগুলো (যেগুলো সকালে আমরা এখানে রেখে গিয়েছিলাম) নিয়ে নিলাম। বিকাল পৌনে ৫টায় দার্জিলিং পাড়া ত্যাগ করলাম। এবার ক্রমাগত নিচে নামতে হবে।

আবিষ্কার করলাম পাহাড়ে উঠার থেকে নামাটা অনেক কঠিন। পায়ের পেশিতে প্রচণ্ড চাপ পড়ে। যদিও নামার জন্য সময় কম লাগে। আধা ঘণ্টা পর একটা সরু পথ পেলাম। এর একদিকে কয়েকশো ফুট গভীর খাদ, আরেক দিকে জ্বলছে জুমের আগুন। আগুনের তাপে পথ চলাই দুরূহ। এরই মাঝে হঠাৎ দেখলাম রাস্তার উপর একটা বিরাটকার গাছ পড়ে আছে। পুরো গাছটাই আগুনে জ্বলছে।

আমাদের ৪ জনের দলটা একটু থেমে দম নিলাম। বাতাস ক্ষণে ক্ষণে দিক বদল করছে। আমাদের দিকে যখন বাতাস ঘুরে যাচ্ছে তখন প্রচণ্ড গরম অনুভব করছি। বাতাসের এই দিক বদলের জটিল হিসাব শেষ করে শাহাবুদ্দিন পথের কিনারা দিয়ে জ্বলন্ত গাছটা টপকে ওপারে চলে গেল। পিছে পিছে রেজাও পার হয়ে গেল।

এরপর আমার পালা। জ্বলন্ত গাছটার কাছ এসে হিসেব করছি আহত পা নিয়ে কিভাবে পার  হবো? শাহাবুদ্দিনের দেখানো পথে পা বাড়ালাম। জ্বলন্ত গাছটা যখন পার হচ্ছি ঠিক তখনই হাওয়া দিক বদল করে আমাদের দিকে বইতে শুরু করলো। প্রচণ্ড তাপে মনে হল কেউ গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। বাতাসের সঙ্গে আসা ধোঁয়ায় অন্ধ হয়ে গেলাম, নিশ্বাসও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। পেছনে থেকে রিপন চিৎকার করলো, ‘মুভ, মারুফ, মুভ।’ রিপন কখন আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে বলতে পারব না। আমি তখন পায়ের ব্যথা ভুলে ভোঁ দৌড়। আমার পেছন পেছন আসতে গিয়ে রিপনের হাঁটুতে একটা জ্বলন্ত ডালের আঘাত লেগে কিছুটা ছিলে গেল।

গোটা ব্যাপারটা ঘটল মাত্র ৩-৪ সেকেন্ডের মধ্যে। এতো বড় বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার পরও মনে হল-বিপদ ছাড়া কি আর এসব অভিযান সম্পূর্ণ হয়?


বগা লেকের স্থানীয়দের সাথে। বাম দিক থেকে রেজা, লারাম, রিপন, আমি এবং অন্যান্যরা।


এরপর আর কোন নতুন বিপদ না ঘটিয়েই সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ আমরা বগা লেক পৌঁছালাম। বগা লেক ১৯৯৮ সালে মাত্র ১০-১২ ঘর মানুষ নিয়ে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিল। তখন লেকের পাড়ে কোন ঘর-বাড়ি, আর্মি ক্যাম্প, কমলা বাজার এমনকি বগা লেকের নিচের মারমা পাড়াটাও ছিল না।

লেকের পানিতে হাত মুখ ধুয়ে নিলাম। এরই মধ্যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। এরপর গেলাম বমদের গির্জায় প্রার্থনা দেখতে। এরই মধ্যে শাহাবুদ্দিন বগালেকের এক বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে ফেলেছে। সেই বাড়িতে বসে রিপন তার চিকিৎসা পর্ব শুরু করল। সে কোন এক সময় রেডক্রসের সাথে জড়িত ছিল। সেই বিদ্যাটাই প্রয়োগ করল দুই পাহাড়ি যুবকের উপর। (এদের একজন ছিল বগালেকের বর্তমান বিখ্যাত গাইড লারাম বম- যে পরবর্তীতে আমাকে তার আপন ভাইয়ের আসনে বসিয়েছে)। আমাদের আর পাহাড়ি যুবকদের বিভিন্ন কাটা-ছেঁড়া ব্যান্ডেজ করার পর রিপনের কাজে মুদ্ধ হয়ে আমি আর রেজা ওকে হাক্তার (হাতুড়ে ডাক্তারের সংক্ষিপ্ত রূপ) উপাধিতে ভূষিত করলাম।

রাতের খাওয়া সারলাম পেঁপের তরকারি দিয়ে। বান্দরবান এসে এই প্রথম মশার দেখা পেলাম রাতে ঘুমাতে গিয়ে। তবে সারাদিনের ক্লান্তিতে যে গভীর ঘুম হল তাতে সামান্য কয়েকটা মশার অত্যাচার আমরা টের পেলাম না।

পরদিন ভোর ছয়টায় উঠে তাড়াতাড়ি বগা লেকের পাড়ে গিয়ে কয়েকটা ছবি তুললাম। যেহেতু সেদিনই আমাদের চট্টগ্রাম ফিরতে হবে তাই বগা লেকে আর দেরি করলাম না। তবে সেদিনের বগালেকে আমাদের তোলা সামান্য কয়েকটা ছবি এখন আমার কাছে মহামূল্যবান। বগালেকের বর্তমান চেহারা দেখে আমি নিজেই সেদিনের ছবিগুলো মিলাতে পারি না।

এরপর বগা লেক থেকে বিদায় নিয়ে প্রায় ১২০০ ফুট নেমে বগামুখ জলপ্রপাতে আসলাম। (এই জলপ্রপাতের অদ্ভুত অবস্থানের কারণে কখনই এর কোন সুন্দর ছবি তুলতে পারিনি) মনে হল স্বর্গ থেকে মর্তে নামলাম।


বগা লেকের পাড়ে (১৯শে এপ্রিল, ১৯৯৮)


রুমা খালের বর্ণনা যেহেতু আগেই দিয়েছি তাই এর বর্ণনায় আর যাব না। পথেও কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেনি। বগালেক থেকে রওনা দেওয়ার প্রায় ৪ ঘণ্টা পর রুমা বাজার পৌঁছলাম। পৌঁছেই আর্মি ক্যাম্পের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করলাম। রেস্ট হাউজে গিয়ে আমাদের রেখে যাওয়া জিনিসপত্র গুছিয়ে আবার রুমা বাজারে আসলাম।

আর এখানেই আমাদের সুন্দর অভিযানের সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনাটা ঘটল। মাংস ব্যবসায়ী নাসির (যে আমাদের গাইড ঠিক করে দিয়েছিল) গাইড ভাড়া বাবদ ৫০০টাকা দাবি করে বসলো। অথচ আমরা রওনা দেওয়ার আগে বার বার নাসিরকে জিজ্ঞাস করেছিলাম গাইড শাহাবুদ্দিনকে কত দিতে হবে। সে তখন উত্তরটা এড়িয়ে গিয়েছিল। আমরা ইতিমধ্যেই শাহাবুদ্দিনকে জুতা, সানগ্লাস, তেল, মসলাসহ অনেক জিনিস উপহার হিসেবে দিয়েছিলাম। তাই আমরাও ভেবেছিলাম সে ১০০ টাকা দিলেই সন্তুষ্ট থাকবে।(তখন ঢাকা-বান্দরবান বাস ভাড়া ছিল ১১০-১২০ টাকা)। অনেকক্ষণ তর্ক করার পর তাকে ১৫০ টাকা দিয়েও সন্তুষ্ট করতে পারলাম না। অবশ্য তার দাবি ততক্ষণে ২০০ টাকায় নেমে এসেছে। কিন্তু আমাদের আর বাজেট ছিল না বিধায় শাহবুদ্দিনকে অসন্তুষ্ট রেখেই ফিরে আসতে হয়েছিল।

আজকে প্রায় ১৯ বছর পর যদি আমাদের প্রথম কেওক্রাডং সামিটের মূল্যায়ন করি তাহলে অনেক কথাই বলতে হয়। যেমন-

[১] সেসময় ট্রেকিং করা বা দিনের পর দিন পাহাড় বেয়ে কোথাও শখ করে বেড়াতে যাওয়ার চল বাংলাদেশে ছিল না। দেশের ভেতর বেড়ানোর কথা উঠলে সবার প্রথমে চলে আসতো কক্সবাজারের নাম। বড়জোর সুন্দরবন কিংবা সিলেটের জাফলং। প্রচলিত প্রথা ভেঙ্গে এমন একটি অভিযান বের হওয়াটা খুব দুরূহ ছিল। বন্ধু ও আত্মীয় মহলে আমরা পাগল-ছাগল শ্রেণিতে পরিণত হয়েছিলাম। আবার ভোরের কাগজে আমাদের অভিযান কাহিনী ছাপা হওয়ার পর তারাই আমাদের অভিনন্দন জানাতে ছুটে এসেছিল।

[২] ১৯৯৮-৯৯ সালে বা তার আগে বান্দরবনের দুর্গম এলাকাগুলোতে বছরের একটা সময় নীরব দুর্ভিক্ষ চলতো। উত্তরাঞ্চলে আমরা যেটাকে বলি মঙ্গা। এই মঙ্গাপিরীত লোকগুলোই এখন মোটরসাইকেল চালায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা বান্দরবানের নামী-দামি স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে পর্যটন এবং যোগাযোগ অবস্থার উন্নয়ন একটা গোটা জেলার সমাজ ও অর্থনীতিকে কিভাবে বদলে দিতে পারে তার বড় উদাহরণ এই বান্দরবান। আর এই পরিবর্তনের সাক্ষী আমি আমাদের প্রথম অভিযানের পর থেকে প্রতি বছর বান্দরবানের এই পরিবর্তন প্রত্যক্ষ্য করেছি। হ্যাঁ, এখন আমি বলতেই পারি এই পরিবর্তনের সূচনা আমাদের ত্রি-রত্নের হাত ধরেই হয়েছিল।

[৩] আমাদের আগে আরও ৫টি  অভিযাত্রী দল কেওক্রাডং ওঠার চেষ্টা করে সফল হতে পারেননি। এই তথ্যটা আমরা স্থানীয় লোকজনের মুখেই শুনেছি। আমাদের অভিযানের কাহিনী পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর তরুণ সমাজের কাছে এই বার্তাটা যায় আমাদের বাঙালিদের পক্ষেও পাহাড়ে উঠা সম্ভব। পাহাড়ে অভিযান করতে হলে এই আত্নবিশ্বাসটা খুব জরুরি।

[৪] ভোরের কাগজে আমি আমাদের অভিযান কাহিনী ও ছবি নিয়ে দেখা করি লেখক আনিসুল হকের সঙ্গে। তিনি ছিলেন ভোরের কাগজের ‘অবসর’ ম্যাগাজিনের সার্বিক দায়িত্বে। আমাদের অভিযান কাহিনী পড়ে ও ছবিগুলো দেখে তার প্রথম প্রশ্নই ছিল- আমরা কি সত্যিই তাজিংডং গিয়েছি নাকি সাধারণ কোন পাহাড়ের চূড়ায় ছবি তুলে সেটাকে তাজিংডং বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছি? আমি এধরনের প্রশ্নের জন্য তৈরিই ছিলাম। জবাবে বললাম, আপনি পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপিত ফলকটার দিকে লক্ষ্য করুন। ওখানেই পাহাড়ের পরিচয় দেওয়া আছে। আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য আপনি বান্দরবান ক্যান্টনমেন্টের মাধ্যমে সুনসংপাড়া আর্মি ক্যাম্পে যোগাযোগ করতে পারেন। সেখানে আমরা গাইডসহ আমাদের নাম এন্ট্রি করেছি।

আমার বক্তব্যে সন্তুষ্ট হয়ে আনিসুল হক সাহেব আর কোন প্রশ্ন করলেন না। তিনি আনন্দ রনিকে ডেকে আমাদের অভিযান কাহিনী ছাপানোর ব্যবস্থা করতে বলেন।

১৯৯৮ সালে আমরা নিতান্তই অনভিজ্ঞ তরুণ ছিলাম। তারপরও একটা সফল অভিযান শেষ করে তার সমস্ত প্রমাণ এবং তথ্য উপাত্ত সংগ্রহে আমরা যথেষ্ট পরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছি বলেই আমি মনে করি। কারণ আমাদের এসব তথ্য-উপাত্ত এবং পরামর্শ অন্যান্য নতুন অভিযাত্রীদের কাজ সহজ করে দিয়েছিল।

এক্সপ্লোর অদ্রি এর সৌজন্যে এম ওমর কাউছার ।

Top