porno izle sex hikaye
corum surucu kursu malatya reklam

হিমালয়ের গহীণে – প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মাঝে যাত্রা (১ম-কিস্তি)

895241216073717.jpeg
ছোটবেলা থেকেই ভ্রমণ কাহিনীগুলো প্রবলভাবে টানতো, লেখকের বর্ণনায় আর তাঁদেরচোখে মুগ্ধ হয়ে দেখতাম পৃথিবীর সব অপরূপস্থান, যেন পড়তাম না। সেই যে অন্নদাশংকর রায়ের পথে প্রবাসে কবে মাথায় ঢুকে পড়েছিলো তারপর আমাদের হাসনাত আবদুল হাই এর ট্র্যাভেলগ-এর জন্য প্রতি সপ্তাহে সংবাদ সাময়িকীর অপেক্ষা, এক সময় ভ্রমণ সাহিত্য আটপৌঢ়ে ভ্রমণ গাঁথার বাইরে কখন ভালোলাগার জায়গা করে নিলো টের পাইনি, হালের মইনুস সুলতানের লেখার মুন্সিয়ানায় আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক অ্যাডভেঞ্চারের কারণে আলাদা করে অ্যাডভেঞ্চারের কথা ভাবার প্রয়োজন পড়েনা কিন্তু প্রায় সমতল এ দেশটির এত কাছেই যে শুধু বৃহৎ পর্বতমালা আছে তাই নয় সুউচ্চ শৃঙ্গগুলো যে হাতের নাগালে। বি¯তৃত হিমালয় জুড়ে কত না অজানা প্রকৃতি আর সংস্কৃতির বৈচিত্রময়তা আছে তা বাঙালীর অজানা এখনো। মাত্র বছর তিনেক আগে কীর্তিমান মুসা ইব্রাহীম পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়ায় বাংলাদেশের প্রথম মানুষ হিসাবে পা রাখলো অথচ এই সর্বোচ্চ শৃঙ্গের আবিষ্কার কিন্তু একজন বাঙালীই করেছিলেন। সেই রাধানাথ শিকদার কিন্তু একেবারেই অন্তরালে। আমাদের দেশের পাহাড় ঘেরা শহর চট্রগ্রামে আমার জন্ম হলেও বুদ্ধি হবার পর প্রথম পাহাড়ের সাক্ষাৎ কলেজ জীবন শেষে বন্ধুদের সাথে চট্রগ্রাম, রাঙ্গামাটি গিয়ে, তখনকার সরু ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক পেড়িয়ে সীতাকুন্ডু পৌঁছে ঐ সব টিলা সদৃশ্য পাহাড় দেখে আমি যারপরনাই আহ্লাদ অনুভব করলাম। সবাই মিলে ঠিক করলাম চন্দ্রনাথ পাহাড়ে উঠবো। সে কি উত্তেজনা! সেইপথ আজ জনজঙ্গলে পূর্ণ। এখন চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ওঠার নানান উপায় আর দোকানের উৎপাত। সেই যে পাহাড়ের মায়া গায়েমাখলাম এখন অব্দি বহন করে চলেছি সযতনে সঙ্গোপনে।

পৃথিবীর বহু পর্বতমালার সাথে পরিচয় আমার ঘটেনি কিন্তু ঘটেছে পর্বতমালার সেরা হিমালয়ের সাথে। বাবা-চাচার কাছে গল্প শুনতাম তাদের ছেলেবেলার কালিম্পঙ, কার্শিয়ঙ, দার্জিলিং, টয় ট্রেনআর ঘুম রেল ষ্টেশনের। কল্পনায় আঁকতাম ছবি, সন্ধ্যের আগে শরতের মেঘ আকাশে ভেসে উঠলে মনে হত ঐ বুঝি হিমালয়ের সব পর্বতমালা, নিজের মনের রঙে সাজাতাম সব। পরিণত বয়সে পৌঁছে জীবন আর জীবিকার খোঁজে উপেক্ষা করেছি পাহাড়। অবশেষে যখন যেতে তাগিদ অনুভব করলাম, ঠিক করলাম পর্বতমালার মাঝে সবার সেরা হিমালয়ের এভারেষ্ট হবে আমার পথ। আমি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পর্বতারোহী নই। আর চল্লিশ ছুঁই-ছুঁই বয়সে শারীরিক সক্ষমতাও অনেক সহায়ক- তাও নয়, তবু মনের জোরই সম্বল। যখন সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করলাম এবারই যাব এভারেষ্ট বেইস ক্যাম্প। যাব যাব করে বহুদিন হলো ২০০০ এর শুরু থেকেই! সেই তখন অমরেন্দ্র চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘ভ্রমণ ট্রেকিং’ বইটি আমি আমার বন্ধুর কাছ থেকে মেরে দেয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। বই চুরি বলে অপরাধ নয় তাই বহু মানুষকে বহু চুরির অবাধ সুযোগ নিজে দিলেও এই একমাত্র বইটি আমি নিজে হস্তগত করেছি প্রকাশ্যে, বন্ধুকে বলেই। হিমালয় জুড়ে সব পর্বতমালায় ঘুরে বেড়ানোর চমৎকার বিবরণ, তার মাঝে ‘এভারেস্ট হাইওয়ে’ আমাকে বিশেষ আর্কষণে বাঁধলো।

২০১২ এর শুরুতে সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করেবসলাম, বন্ধুবর সৌরভ মনসুর চাঁছাছোলা প্রশ্ন করে বসলো। তুই কি এভারেস্ট বেইস ক্যাম্প গিয়েছিস এটা সবাইকে বলার জন্য যেতে চাস, আমার উত্তর না। আমি আসলে কতদূর যেতে পারবো জানি না কিন্তু যাবার উদ্দেশ্য হল প্রকৃতির বিশালতায় হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়াগুলো নিজ চোখে দেখতে চাই, শেরপাদের সংস্কৃতি আমি অনুধাবন করতে চাই, সৌরভ মনসুর বাংলাদেশের সবচাইতে বড় ট্যুর অপারেটর গাইড ট্যুরের সাথে জড়িত সে উৎসাহ দিলো তবে যা তুই, কিন্তু বড় বিপদসংকুল পথ। আমার যাত্রাকালে তিন বিখ্যাত বাঙালী পর্বতারোহী এম এ মুহিত, নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরিন চূঁড়ায়উঠার জন্য ইতোমধ্যে রওনা হয়ে গেছে বেইস ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। এর মাঝে আমার ফেইসবুকের মাধ্যমে ওয়াসফিয়ার সাথেই যোগাযোগআছে। অনলাইন তথ্যভান্ডার ঘেঁটে যাবার প্রস্তুতি আমার চললো মার্চ মাসে। এপ্রিলের শুরুতেই আমাকে যেতে হবে দিল্লী ও কলকাতায় রবীন্দ্র সার্ধশত বার্ষিকীর রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে রবীবাবুর পাহাড় আর তার মানুষদের নিয়ে নাটক ‘মুক্তধারা’ মঞ্চায়নে, ফিরে এসে সময় পাবো না তাই খুঁজে বের করতে লাগলাম কি কি উপকরণ লাগবে আমার। কাঠমন্ডুতে আছেপ্রচুর ট্যুর অপারেটর। তারা পুরো ট্যুরটাই অর্থের বিনিময়ে পরিচালনা করে থাকে।আমি এদের ক’জনের সাথে যোগাযোগ করলাম, পরেমনস্থির করলাম নিজেই যাব শুধু একজন পোর্টার সঙ্গী করে হিমালয়ের গহীনে ‘সাগরমাথা’ ভ্রমণে।

এভারেষ্টকে নেপালীরা বলে সাগরমাথা আর আরেক ভাগীদার তিব্বতীয়রা গো মো গ্ল্যাংমা (CHOMOLUNUMA) মানে পবিত্র মাতা। ঢাকা থেকে কাঠমন্ডুর যোগাযোগ খুব ভালো, প্রথমবার ২০০০ সালে আমি সড়ক পথে গিয়েছিলাম তারপর বহুবার আকাশ পথে। বিমান বাংলাদেশের প্রতিদিন ফ্লাইট আছে আর ভাড়াও অন্যদের তুলনায় প্রতিযোগিতামুলক। এবার ভালো হলো কারণ ফ্লাইট সকালে থাকায় সারাদিন প্রস্তুতির সুযোগ পাওয়া যাবে কাঠমন্ডুতে। শুধু ইন্টারনেটে বুকিং দিয়ে গেছি কাঠমান্ডু থেকে লুকলা পর্যন্ত তারা এয়ার এ।

২৪ এপ্রিল মঙ্গলবার আমার যাত্রা ঢাকা থেকে শুরু হলো একটু বেশী আগেই কারণ হরতাল, তাই বিমানবন্দরে নির্ধারিত সময়ের বেশ আগেই পৌঁছে অপেক্ষা। নানান পরিচিত মানুষজনের সাথে দেখা, ভ্রমণের কারণ শুনেই চোখ কপালে তুলে তাকালো। বিমানের নানা বদনাম কিন্তু একেবারে ঠিক সময়ে ছাড়লো ঢাকা। বিমান বাংলাদেশের-এ ভ্রমনের বড় সুবিধা হলো উড়োজাহাজগুলো সুপরিসর, প্রাইভেট কেম্পানিগুলোর মতো বিরক্তিকর ক্ষুদ্র নয়। ক্যাপ্টেন মেহেদি চালাচ্ছিলেন বিমান, তার কাছে গেলাম ককপিটে। উনি সাদরে অভ্যর্থনা করলেন আর দূরের পর্বতমালার বর্ণনা দিতে লাগলেন। কেমন স্বপ্নময় সব পর্বত মেঘেদের উপর ভেসে আছে অপার রহস্য নিয়ে। পরবর্তিতে জানতে পারলাম গল্পের সূত্র ধরে উনি আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয় বটে। কাঠমন্ডুর ফ্লাইট খুবই সংক্ষিপ্ত, ককপিট থেকে কটা ছবি তুলতেই দেখলাম বিমান নিম্নগামী,নিচে দেখা যাচ্ছে কাঠমন্ডুর সব বাড়িঘর অগোছালো ভীষণ।

কাঠমন্ডু ভ্যালীর ত্রিভূবন বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম। বাইরে কড়া রোদ অর্ভ্যথনা জানাল। কাঠমন্ডুতে অবতরণের ভিসা পাওয়া যায় সহজেই, যাতে আগে থেকে ভিসা করতে হয়না। ত্রিভূবন বিমানবন্দর গেলো দশ বছরে তেমন কোন উন্নতি লাভ করেনি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায়। তবে ভিসা পাওয়া গেল দ্রুততায়। বাইরে বেড়িয়েই ট্যাক্সিওয়ালাদের দৌরাত্ব। প্রি-পেইড ট্যক্সি আছে কিন্তু ভাড়া বেশী। অনেক কমে একটা ট্যাক্সি ঠিক করলাম থামেল পর্যন্ত। ওঠার পরই ট্যাক্সিওয়ালার প্রশ্ন হোটেল ঠিক আছে তোমার? বুঝলাম কম ভাড়ার কারণ। আমি বললাম তোমার পছন্দ মত নিয়ে যাও, আমার পছন্দ হলে থাকব।

মাত্র ৮০০ নেপালী রূপীতে মোটামুটি একটা হোটেলে উঠলাম। রিসিপশনে জিজ্ঞাসা করলাম তারা এয়ার এর অফিস কই। করিৎকর্মা ওরা বললো কত টাকায় তোমার নিকট রফা হয়েছে তার চাইতে আমরা কমে দেব আর তোমাকে কষ্ট করতে হবে না, পৌঁছে যাবে তোমার রুমে। চলে এল এলপাইন ক্লাব অব হিমালয়ার দ্বিপেন্দ্র বৎসালা। সজ্জন ব্যাক্তি আমাকে ঞওগঝ যোগাড় করে দিলো দ্রুত, অতিরিক্ত খরচ হলো তিন ডলার মাত্র। অভিজ্ঞ পোর্টারও মিলে গেল দৈনিক ১২০০ নেপালী রূপীতে। থাকা খাওয়া তার, আমি দরিদ্র দেশের মানুষ পোর্টারই আমার গাইড হবে। দ্বিপেন ইন্সুরেন্স করতে মানা করলো, শুধু শুধু তোমার প্রায় ৫০০ ডলার বেরিয়ে যাবে। হোটেল থেকে বেরিয়ে তার অফিসে বসে গনগনে দুপুরে শীতল বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে সব কাজ প্রায় শেষ।

দীপেনের পরামর্শগুলো খুব কাজের ছিল। তবে তাঁকে আমার পোশাকগুলো দেখিয়ে দিলে পুরো ভ্রমণটা আরো আরামদায়ক হতো বটে। অভিজ্ঞতাহীনতায় আমি দেশ থেকে বেশ ভারী চামড়ার বুট নিয়ে এসেছি তা বুঝতে আমার ফেরার সময় হয়ে গিয়েছিল। কাঠমন্ডুতে বিশেষ করে থামেলে খাবারের নানান বৈচিত্রতা আছে। ডাল ভাত খুব জনপ্রিয় নেপালীদের মাঝে, পরবর্তী দিনে আমার কপালে কি খাবার আছে তাই ডাল ভাত আর সাথে মাছকেই সবচাইতে যৌক্তিক মনে করলাম আমি। এরপর পাহাড়ে ওঠার সামগ্রীর দোকানে দোকানে ঘোরাঘুরি। দুটো মাউন্টেন ষ্টিক কিনে ফেললাম। কত রকমের জিনিসপত্র যে লাগে পাহাড়ে উঠতে। অনভিজ্ঞ আমি প্রায় কিছু ছাড়াই উঠতে চলেছি এভারেষ্টর পথে। সন্ধ্যায় থামেল বেশ জমজমাট। খোলা বাগানের রেস্তোরাঁয় দেশী-বিদেশী লাইভ গানের জমজমাট পরিবেশনা। নর্থ এন্ড ক্যাফে আমার প্রিয় বাগান রেস্তোরাঁ, ওখানে বিকেলে গান শুনি আর ভাবি কাল এ সময় থাকব কই আমি। আমার হ্যাভারস্যাকে প্রয়োজনীয় কাপড় জামা ভরে নেই। অতিরিক্তগুলো আর একটি ব্যাগে করে হোটেলের জিম্মায় রেখে যাই, খুব ভোওে ফ্লাইট তাই আর দেরি নয় ঘুমের।

হোটেলের ঠিক করা ট্যাক্সিতে হাজির হই ত্রিভূবন এয়ারপোর্টেরঅভ্যন্তরীণ র্টামিনালে, খুবই করুণ অবস্থা দারিদ্র পীড়িত এই দেশের এয়ারপোর্টের কিন্তু পরিব্রাজকের কোনো অভাব নেই, অগণিত সব বয়সী মানুষের আনাগোনা এখানে। প্রতিটি ফ্লাইটে নেপালীদের জন্য ভাড়া আলাদা। বেশ কম আর আমরা যারা বিদেশী তাদের জন্য ডলাওে ভাড়া। তবে নেপালের সর্বত্র সার্কভুক্ত দেশের নাগরিক হিসাবে কিছু সুবিধা মেলে। হঠাৎ ভয় পেয়ে বসে লুকলা এয়ার ষ্ট্রিপ সম্পর্কে এর ওর সাথে কথোপকথনের ভিত্তিতে, অপেক্ষার প্রহর গুণি বহির্গমণ লাউঞ্জে। আগে থেকে শুনেছি যত সকালে যাত্রা তত ভাল কারণসকাল গড়িয়ে দুপুরের দিকে যেতেই পাহাড়ের গায়ে মেঘ জমে ওঠে আর বিমান চলচল বন্ধ হয়ে যায়। আমার খুব সময় মাপা যাত্রা পরিকল্পনা, একটু এদিক সেদিক হলেই বিপদ। বাসে করে রানওয়েতে যেতে হবে, বাসে উঠে যাত্রী গণনা শুরু হলো ১৩ জন যাত্রী বুক এর ভেতর ধুকপুক, শুরুতেই আনলাকী থার্টিন বুঝি, হঠাৎ করে এক দীর্ঘদেহী ১৪ নম্বর যাত্রী হিসেবে বাসে প্রবেশ করায় স্বস্তি ফিরে এলো। পরবর্তিতে অত্যন্তসজ্জন এই দীর্ঘদেহী জেসন আমার পথে বহু স্থানে বিশ্রামে আড্ডায় সঙ্গি ছিল।

যুক্তরাষ্টের ক্যালিফোর্নিয়ায় বাস, এসেছে ইমজা সে (আইল্যান্ড পিক) চূড়ায় উঠতে। এর দেহের গঠন দেখে মনে হলো ও তো দু দিনেই হেঁটে ১০ দিনের পথ পাড়ি দিতে পারবে। স্বস্তিদায়ক জেসনসহ বাস ছেড়ে এসে রানওয়েতে দাঁড়াল একটু মেঘলা আবহাওয়া দেখে মনে শঙ্কাও জাগছে যদি কোন কারণেফ্লাইট বাতিল হয় সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। অগ্নি এয়ার এ আমার টিকেট ছোট ছোট ডরনিয়ের, টুইন ওটার বিমান। বুদ্ধা এয়ার, তারা এয়ার,গোর্খাএয়ার, নেপাল এয়ার, সিতা এয়ার পটাপট এসে থামছে যাত্রী নামছে দ্রুত, আবার দ্রুত যাত্রী উঠিয়েই উড়াল দিচ্ছে। আমরা বাসে বসেই রইলাম। জেসান উসখুস করছে তার বাথরুম পেয়েছে, আমি পরামর্শ দিলাম চুপ করে নেমে ঘাসের ফাঁকে গিয়ে সেরে নাও, বোধহয় পরামর্শ পছন্দ হয় নাই, আমি আমার দেশাল বুদ্ধিতে তাকে পরামর্শ দিয়েছি তার মুখ করুণতর হচ্ছে আর অপেক্ষার পালাও শেষ হচ্ছে না। বিমান যে আকারের সেখানেও বাথরুম থাকার সম্ভবনা নেই। জেসান এই কথা শুনে আর থাকতে পারলো না। বাসে বসেই দেখা জেমস এ জিয়ামবর্ণের সাথে তার গলায় বাংলাদেশের গামছা দেখে যেচে গেলাম আলাপ করতে। ঢাকায় ইউএসএআইডির কর্তা ব্যাক্তি ম্যাট ফ্রাইডম্যানও একসময় নেপালে কাজ করতো যার সাথে আমার বেশ সখ্যতা ছিল। দেখা গেলো জিয়ামবর্ণও ম্যাটের ভালো বন্ধু ও ম্যাটের মতনই এক নেপালী মেয়েকে বিয়ে করেছে যিনি নেপাল ইউএসএআইডি তে কাজ করেন আর সে নিজে একটা আর্ট গ্যালারী চালান।

ধামরাইতে আমার বন্ধু সুকান্ত বণিক তার কর্মীবাহিনীকে নেপালে যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল মার্কিন দূতাবাসের সহায়তায় জিয়ামবর্নই ছিল মুখ্য ব্যাক্তি সে আয়োজনের। তার সাথে গল্প জমে উঠলো আমাদের ধামরাইয়ে সুনিপূণলষ্ট ওয়াক্স মেথডে সৃজন হওয়া শিল্পকর্ম দিয়ে। সে বহুবার আমাদের দেশে এসেছে এবং পাবনায় বোনা এ গামছাটি ধামরাই থেকে কেনা তার। এর মাঝে অগ্নি এয়ারের ছোট্ট বিমানটি রানওয়েতে ধীর গতিতে এগিয়ে আসতেই আমাদের ১৪ জনের চাঞ্চল্য দেখা দিলো। ড্রাইভার বাসটি একটু এগিয়ে বিমানের কাছে নিয়ে এলো আমাদের নামার পালা শুরু, এই বাসেই আগত যাত্রীরা র্টামিনালে যাবে। আমি ছবি তোলার আয়োজনে ব্যাস্ত হতেই দেখলাম বাকি ১৩ জন উঠে গেছে বিমানে, দৌড়ে বিমানের ভেতর ঢুকলাম, কেমন যুদ্ধ বিমান টাইপের। দুদিকে জানালার পাশে একটি করে সিট। দরজার পাশে সিটটি নেই মোট ১৩ জনের বসার ব্যবস্থা। আমি বসব কই বিমানবালা তরুণীটি এগিয়ে এল হাসিমুখে পেছনে মালপত্রের সাথে দুটি সিট আছে বিমানবালার ও আমার। জানালার পাশের টিতে আসন নেই। বিমান ওঠা নামায় খুব তাড়া, দ্রুত বিমান রানওয়েতে চলতে শুরু করলো। বিমানবালা তরুণীটি সামনে থেকে ট্রে ধরে পেছনে আসছে। ভাবলাম নিশ্চয় চকলেট বা অন্য কিছু হবে। দেখি কাছে আসতেই ট্রে তে তুলো যাদের কানে সমস্যা হয় তাদের সমাধানে এই উদ্যোগ বিমান কর্তৃপক্ষের। বিমানবালা শুরুতেই জানিয়ে দিল যন্ত্রের মতো এই ফ্লাইটে সিটবেল্ট কখোনই খোলা যাবে না। মোটামুটি নির্বিঘেœ বিমান রানওয়ে ত্যাগ করলো। আমি বহুবার দেশের আভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে ছোট বিমানে চড়েছি কিন্তু এত ছোট বিমানে চড়ার অভিজ্ঞতা এই প্রথম।

কাঠমন্ডু ভ্যালী ছাড়তে বিমান বেশী সময় নিল না। পুরো নেপাল জুড়েই পর্বতমালা যেন। সবুজ পাহাড় আর দূরের বরফে মোড়া শ্বেত শুভ্র চূড়াগুলো অপার রহস্যময়তায় মোড়া। ২০ মিনিট যেতেই বিমান একটা গোত্তাও খেলো যেন, ধাতস্ত হতেই প্রচন্ড কম্পন, বাইরে তাকিয়ে দেখি ধবধবে সাদা মেঘে চারিদিক আচ্ছন্ন। কম্পমান বিমান ভীতিকরভাবে এগিয়ে চলেছে মেঘেদের ফাঁক গলে। মেঘ একটু পাতলা হতেই ভয়টা আরও বাড়লো, বিমানের এত কাছে সব পাহাড় একটু এদিক সেদিক হলেই বুকের হৃদস্পন্দন প্রথম দিনই এমন পর্যায়ে গেলে কিভাবে হবে, আর যাত্রা শুরুর জায়গায়ই যদি না পৌঁছাই আজ, এই ভাবতে ভাবতে দূরের পাহাড়ের খাঁজে বিমান বন্দরের দেখা মেলে, একি এটাতে বিমান নামবে কোথায়? পাহাড়ের গায়ে ছোট্টএকটি এয়ার ষ্ট্রিপ দৈর্ঘ্য মাত্র ৪৬০ মিটার। আমাদের বিমান গোঁ গোঁ করতে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে থাকাকে উপেক্ষা করে নিরাপদেই নামলো লুকলায়। কেন যেন খুব তাড়াহুড়ো ওঠা নামায়! আমরা বিমান থেকে নামতে না নামতেই আর এক দল চড়ে বসলো, আর আমি রানওয়ে না ছাড়তেই বিমানটি উড়াল দিয়ে দৃষ্টিতে পাহাড়ের গায়ে একটি ছোট পাখিতে পরিণত হলো। কাঠমন্ডুতেদ্বীপেন বলে দিয়েছিল এয়ারপোর্টে আমার পোর্টার থাকবে। সব পরিব্রাজকের দলের ভিড়ে আমি খুঁজি কে এল আমার নাম নিয়ে এখানে। লুকলা এয়ার ষ্ট্রিপটা কেন যেন খুব পছন্দ হলো আমার, হয়তো ভীতিকর যাত্রার শেষে স্বস্তি এনে দেয়ায়।

আগমণ টার্মিনাল নেই,আমি খুঁজে পাই একজনকে যে ‘কবির’ নাম লিখে দাঁড়িয়ে আছে। পরিচিত হই আমার পোর্টার কাম গাইড এর সাথে পেশাল ঢাল, আমার কাছ থেকে ব্যাগ এর ট্যাগ চেয়ে নিয়ে হাজির হলো আমার ব্যাগ পত্তর নিয়ে। বললো চলো এবার। লুকলা সম্পর্কে বই পড়ে যেটুকু জানা বাস্তবের লুকলা অনেক ভিন্ন। আমার কাছে তো লুকলা বড় শহরই বটে। সোলোখুম্বু জেলায় ৯৩৮৩ ফুট উঁচুতে এই এয়ারপোর্টকে ঘিরেই নেপালের উত্তর পূর্বকোণে এ শহরটি। বইয়ে পড়েছিলাম রুক্ষ জমিতে একটি মাঠের উপর এই এয়ারষ্ট্রিপ, কিন্তু ছোট হলেও বেশ গোছানো এয়ারষ্ট্রিপ ‘তেনজিং হিলারি’ এয়ারপোর্ট। এভারেষ্ট জয়ের পুরোধা দু’জনের নামেই তার নামকরণ। এয়ারপোর্টের বাইরে নানান লজ রয়েছে। এভারেষ্টে যাওয়া আসার পথে অভিযাত্রীদের বিশ্রাম নেবার জায়গা। ছবির মত সুন্দর সব লজ বিমানবন্দরের চারপাশ ঘিরে। লুকলায় যদি বিমানে না এসে নামতাম তবে গাড়িতে কাঠমন্ডু থেকে সর্বশেষ পথ জিরি পর্যন্ত। জিরি থেকে লুকলা আসা যাওয়ায় জেনেছি ১২ থেকে ১৫ দিন লাগে। ৫০ মিনিটের ফ্লাইট ১৫ দিনের সময় আর পরিশ্রম বাঁচিয়ে দেয়। জিরি থেকে পোর্টাররা মালপত্র বহন করে সোলোখু  জেলায় দৈনন্দিন পণ্যের চাহিদা মেটায়। আমার কাছে বেশ বড়সরই মনে হলো লুকলা শহরটি।

পোর্টার এসে মালপত্তর রাখে দি নেষ্ট নামে লজ এর চাতালে। শীতল হাওয়া গায়ে কাঁপন ধরাতে সময় নেয় কারণ বিমানের ভেতর ভয় ধরানো অনুভবের উত্তেজনায় এখনো ডুবে আছি। বইয়ে পড়া অনুসারে সব ধরনের গরম কাপড় নেবার নির্দেশ আছে, আমিও নির্দেশের বাইরে যাইনা। চমৎকার রোদ উঠেছে আজ। হঠাৎ মন ভালো হয়ে গেল, কাঠমন্ডুর দ্বিপেন এর দেয়া খাম পোর্টার পেশাল এর কাছে হস্তান্তর করি। পেশাল ফোনে যোগাযোগ করিয়ে দেয় দ্বিপেন এর সাথে। পেশাল জানায় সে বাড়ি যাচ্ছে প্রস্তুত হয়ে আসতে। এই ফাঁকে আমার খাওয়া দাওয়া করতে চাইলে যেন করে নেই। এমন পোশাক আশাক আমার কাছে অস্বস্তিকর বটে তবু অভ্যস্ত হবার চেষ্টা করি। সেই র্দীঘদেহী জেসানও এসে জুটলো এই বিশ্রামে। অবাক হলাম একটি হাফ প্যান্ট আর পাতলা র্শাট ছাড়া কিছুই অতিরিক্ত নেই তার পড়নে। সংকোচে আর জিজ্ঞেস করা হলো না সে শীত কেন অনুভব করছে না। খাওয়া সেরে নিলাম এখানে। লুকলাতেও খাবারের দাম বেশী, কারণ বিমানে নয়, জিরি থেকে র্পোটার নিয়ে আসে সব। রুক্ষ ভূমির ফাঁকে ছোট ছোট সব্জির বাগান চোখে পড়লো। পেশাল ঢাল এসে হাজির। আমার ঢাউস সাইজের হ্যাভারস্যাকের গায়ে রেইন প্রটেকটর লাগিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। প্রথমে লুকলা শহরের মাঝ দিয়ে। চারপাশে দোকানপাট প্রচুর।

পাহাড়ে ওঠার সরঞ্জাম ছাড়া স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের জিনিসপত্রের বিকিকিনি। শহর ছাড়ার মুখে বিশাল প্রেয়ার হুইল আর একটি সুদৃশ্য গেইট। তারপর হালকা বনের মধ্যে দিয়ে নিচে নামা। বইয়ে পড়া বর্ণনা প্রথম দিন সামান্য হাঁটা পথ পাড়ি দিয়ে ফাঁকদিং এ পৌঁছে বিশ্রাম নিন। কিন্তু লুকলা থেকে ফাঁকদিং এর দূরত্ব মোটেও সামান্য নয়। লুকলার চাইতে কম উচ্চাতায় ফাঁকদিং গ্রাম ৮৭০০ ফুট। শুরুতে চারপাশের দৃশ্যাবলী চমৎকার কিন্তু ঘন্টা খানেক হেঁটে এই উচ্চতায় বেশ ক্লান্ত অনুভব করি। অনেকটা নিচে নেমে একটা ঝুলন্ত ব্রিজ, চাঙ্গা অনুভব করি এমন ব্রিজ ছবিতেই দেখেছি নিচে বহু নিচে খরস্রোতা নদী বয়ে চলেছে, নদীর নাম দুধকোশী। এ অঞ্চলে নদীকে বলে কোশী। নদী পেরিয়ে উঁচুতে ওঠা ছবির মত সুন্দর গ্রামের মাঝ দিয়ে হাঁটা পথ। আমার চারপাশে সব সাদা চামড়ার সহযাত্রী, আমাকে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে কেউ কেউ লুকলায় ফিরে আসছে। যারা ফিরে আসছে তাদের চোখ মুখ উজ্জ্বল চক চক করছে আনন্দে, প্রথম দিন তাই ভেবেছি সাফল্যের সাথে ট্রেকিং সমাপ্তির আনন্দহয়তো তাদের চোখে মুখে। পড়ে মনে হয়েছিল তাঁর সাথে অমানুষিক কষ্ট সমাপ্তির আনন্দ যুক্ত ছিল। সকলে হাসি মুখে সম্ভাষণজানায় সকলকে। নানা দেশ থেকে এসেছে কত মানুষ। মনে হল এভারেষ্ট হাইওয়ে বলার পেছনের কারণ এটাই মূখ্য- পৃথিবীর বহু দেশের মানুষকে এক পথে পেতে এটাই অন্যতম। এই পথে চেপলু বড় গ্রাম তারপর একটু সমতল স্থানের নাম ঘাট। এটি কোন নদীর ঘাট নয়। অনেক সবুজ এক উপত্যকা। সব ক্লান্তি দুর হয়ে গেলো এই জায়গায় পৌঁছে, অপূর্ব সব বাড়িঘর, আকাশ মেঘলা, পাহাড়ের গায়ে মেঘ জমে উঠেছে। আর অনভিজ্ঞ আমি মোটামুটি গায়ে যা চাপিয়ে ছিলাম পরিশ্রমের ফলে গরমে খুলে একটি হাতাওয়ালা টি শার্টে এসে নামিয়েছি।

একটা রেস্তোরাঁ দেখে মনে ধরলো পেশাল কে বললাম এখানে থামি, আসলে বিশ্রাম নেয়াটাও কিন্তু অন্যতম উদ্দেশ্য। আমার এই রেস্তোরাঁয় কেমন স্বপ্নময় মনে হয়। ছবিতে দেখা লামাদের আসবাবপত্রের সাথে মিল, ক্ষিদে নেই আমার তাই ঠিক করেছি ফাঁকদিং পৌঁছেই খাব, যেহেতু পথ বেশী নয়। এই পর্যন্ত যাত্রা মোটামুটি সহনীয় ছিল আমার জন্য। তারপরের পরিশ্রম আমাকে বিদ্ধস্ত করে তোলে প্রথম দিনই। রেস্তোরাঁর সবুজ বাগানে সাদা চেয়ার টেবিলে বসে চা-এর কাপে চুমুক দেই, প্রতি কাপ ৫০ রূপি, বেশ সস্তাই মনে হলো। এক শেরপানী চালায় রেস্তোরাঁ, তার ছোট বাচ্চা সারা জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে মনের আনন্দে। হাওয়া উঠলো কনকনে শীত গায়ে এসে বিঁধে। শুধু এক কাপ চা খাওয়ার বিনিময়ে রেস্তোরাঁর ভেতরে ঢুকতে বাঁধে কিন্তু যখন বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়া শুরু হলো অগত্যা আশ্রয় নিলাম ভেতরে। হুড়মুড় করে আমাদের চামড়ার রঙে রাঙা আরও তিনজন ঢুকলো। পরিচয় হলো এই তরুণ দল এসেছে পুনে থেকে। নিয়মিত পাহাড়ে ওঠে, তাদের পোশাক আশাক আর ব্যাগের আয়তন দেখেই বোঝা গেল। কোন পোর্টার নেয়নি তারা। খুব প্রাণোচ্ছ্বল এই দলটিকে আমার বেশ ভাল লাগলো। বৃষ্টিতে কিছুক্ষণ আটকা থাকার সময়টুকু আনন্দময় হলো এদের সান্নিধ্যে। এই রেস্তোরাঁয় ওদের একজন ১০ রূপীর রা-রা নুডুলস ২০০ রূপীতে কিনে খেলো। আর একজন কাঠমন্ডু থেকে নিয়ে আসা খাবারে দুপুরের আহার সারলো। বৃষ্টির তোড় কমলেও ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির মাঝেই যাত্রা আবার শুরু করলাম। একটু দীর্ঘ বিশ্রামে ক্লান্তিও যেনো যেকে বসলো আমার উপর। পেশাল তাড়া দিল নইলে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। ঘাট পেরুলেই নারনিং, চমৎকার জায়গা বড় বড় পাথরের চাইয়ে শেরপারা তাদের প্রার্থনা বাক্য অপূর্ব সৃজনে ভরিয়ে রেখেছে। আর কিছু পর পর প্রার্থনা চক্র তো আছেই। পথে যাবার কালে এই চক্র ঘোরালে র্দূভোগ কমে বলে শেরপা ও স্থানীয়রা বিশ্বাস করে। আমিও ঘোরাই কয়েকটা। বৃষ্টির তোড় বাড়ছে নারনিং পার হতেই জোরে এলো, রাস্তার পাশেই একটি জীর্ণ ঘরে আশ্রয় নিলাম। বুঝলাম এ ঘরে ইয়াক আর মানুষ একসাথে থাকে। চাও বিক্রি হয়, গৃহের অস্বস্তি দূর করতে আমার আর পেশাল এর জন্য চার অর্ডার দিলাম। ছাদে অসংখ্য ফুটো,গা বাঁচিয়ে ঘরের এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি অবশেষে আর ধৈর্য্য কুলালো না বৃষ্টির মাঝেই রওনা দিলাম।

আমার সদ্য কেনা বুট জোড়া কাদা পানিতে করুণ অবস্থা। আর সংকীর্ণ পাহাড়ী পথে একটু পিছলে গেলেসর্বনাশ। চুখ-হাওয়া নামে এক জায়গায় পৌঁছালাম, এবার পেশাল আরও তাড়া দিলো যাতে না থামি, পথ যেনো ফুরোচ্ছেই না, দেহে মনে ক্লান্তি বিপুল বিস্তার ঘটিয়ে চলেছে। এক সময় ক্লান্তিতে পা ভারী হয়ে পড়ে তবু থামা যাবে না। এগিয়ে চলি ফাঁকদিং এর পথে। অবশেষে বৃষ্টি কিছুটা কমে আসে।ফাঁকদিংএরও দেখা মেলে, পথেএর ওর কাছে কয়েকটা ভাল লজ এর নাম জেনেছিলাম এখন আর সেগুলো খোঁজার সামর্থ্য নেই, পেশাল একটা ভদ্রসমেত লজে এ নিয়ে গেল। রুম ভাড়া ২০০ নেপালী রূপী। বলে রাখা ভালো নেপালী রূপী আর বাংলাদেশী টাকা সমান সমান। ভাড়া কম হলেও খরচ কম তা নয়,আমার প্রয়োজন গোসল এর। গরম পানির গোসল ৩০০ টাকা, ঠান্ডা পানিতো অসম্ভব এখানে। প্রচন্ড ক্লান্তির কিছুটা দূর হলো গোসলে। সব ভিজে যাওয়া জিনিস শুকাতে দিলাম ঘর জুড়ে। ডাইনিং হলটা বেশ উষ্ণ। মাঝে একটা চুল্লিতে আগুন জ্বলছে, তার চারপাশে বসে সবাই। একটা জাপানী দল এখানে উঠেছে, উদ্দেশ্য খুম্ব হিমবাহের কোন পুকুরে গোসল করে পূণ্য লাভের। বাতাসে গোসল করেই বেঁচে থাকা দায় আর পুকুরে। এই দলে বয়স্ক ব্যাক্তি সত্তোরর্ধ্ব আর তরুণটির বয়স ২৫।তাদেরসাথে গাইড পোর্টার ছাড়াও ভ্রমণ আরামদায়ক করার নানা উপকরণ। এই উষ্ণ রুমেও আমার শীত কমছে না।

কাঠমন্ডু থেকে কিনে আনা কুখরি রাম গরম পানিতে ঢেলে নেই আমার পোর্টার কাম গাইড পেশালকেও দেই একটু। শীত কমার বদলে আরও বেড়ে গেলো তীব্র। উচ্চতা জনিতকারণে এ্যালকোহল একেবারেই নিষিদ্ধ বিশেষ করে আমরা যারাপুরো সমতলের। সন্ধ্যে ৭ টায় রাতের খাবার শেষ করে ঘরে পৌঁছে বিছানায় যেতে না যেতেই ঘুম এসে ভর করে। উচ্চতাজনিত অসুস্থতা রোধে ডায়ামক্স নামক এক ধরনের ওষুধ আছে। আমাকে ঢাকায় এক সুহৃদ ডাক্তার অনেকগুলো কিনে দিয়েছিল, তা খেয়ে সোজা ঘুম। ডায়ামক্স এর বাংলাদেশে নাম এসিমক্স, খেলে প্রচুর পানি খেতে হয় আর বাথরুম লাগে। মাঝরাতে ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে কমন বাথরুমে যাই। এভারেষ্ট অঞ্চলে বেশীর ভাগ লজ-এরই কমন বাথরুম। যে দু’একটা লজের সংলগ্ন বাথরুম তার খরচ অনেক বেশী। ভোওে ঘুম ভাঙ্গলো পেশাল এর ডাকে। দ্রুত তৈরী হয়ে নেই। বইয়ে লেখা আছে এখান থেকে মানজো হয়ে জোরেসাল তারপর নামচে বাজার। যতটা সহজ বর্ণনা তার চাইতে সহস্রগুণ পরিশ্রমের বটে। তাশি তেগারি লজ এন্ড রেষ্টুরেন্ট এ দ্রুত সকালে খাবার খেয়ে অতি ভোরে বিদায় জানালাম এর মালকিন-কে, চমৎকার রাত্রীবাস উপহার দেবার জন্য। ফাঁকদিং ছোট্ট জয়গা। গ্রাম পেরুতেই একটা ঝুলন্ত ব্রিজ। ঐ নদী দুধ কোশীই ঘুরে ফিরে চক্রে পিছেআঁকড়ে রেখেছে। ফাঁকদিং এ খুব দামী থাকার ব্যবস্থাও আছে ‘ইয়েতি মাউন্টেন হোম’ বিলাসবহুল হোটেল কিন্তু শেরপা সংস্কৃতির আধুনিক উপস্থাপনা। বেশীর ভাগ সাদা চামড়ার মানুষজন আসেন গ্রুপ ট্যুর এ, ট্যুর অপারেটরদের মাধ্যমে খরচ একটু বেশী কিন্তু সব কাজকর্ম অপারেটররাই করে দেয়, আমার এ বিশেষ অপছন্দ। ঝুলন্ত ব্রিজ পেরুতেই আমার জিভ বেরিয়ে পড়লো। বিশ্রাম নিচ্ছে ইয়াক আর ঘোড়াগুলো, পিঠে সাহেবদের বোঝা, কিছু সাদা চামড়ার আবার মানবাধিকার নিয়ে কড়া নির্দেশনা, কোন পোর্টার এর পিঠে তাদের মালামাল চাপিয়ে দেয়া অমানবিক। কিন্তু এ অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক নেপালীর প্রধানতম জীবিকা পোর্টার হয়ে মালপত্র টানা। পথে ইয়াক আর ঘোড়ার দলের দেখা মিললে সাবধান হতে হয়। সরু পথের এক পাশে সরে গিয়ে সারিবদ্ধ হয়ে গলায় ঘন্টা বাজিয়ে তারা এগিয়ে চলে। ফাঁকদিং-এ রাতের বিশ্রামের ফলে যাত্রা শুরুতে মধুর ছিলো নদীর কলকল শব্দের পাশ দিয়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে।

সকালের মিষ্টি রোদ বনের ভেতরে এক অদ্ভূত মায়াময়তা সৃষ্টি করেছে। পথে প্রচুর পরিব্রাজক, সবাই যে এভারেষ্ট এর পথেই চলেছে তা নয়, কেউবা নামচে বাজার অবধি,কেউবা দেখতে চলেছে থ্যাংবোচে মনাষ্ট্রি, কেউ চলেছে গোকিয়ো লেক, চোলা পাস দেখতে, কেউবা ইমজা সে’র চূড়ায় উঠতে। বিচিত্র বর্ণের আর দেশের মানুষের সমারোহ পথ জুড়ে। সাইন বোর্ড চেখে পড়ল একটি বাঁ দিক দিয়ে উঠে যেতে হবে পানঝুং গ্রামের দিকে। ইউএনডিপির সহয়তায় সেখানে আদি সংস্কৃতির সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে, সেটা দেখতে চাইলে উঠে যেতে হবে। যে সমস্ত পরিব্রাজক হাতে প্রচুর সময় নিয়ে এসেছেন তাঁরা কেউ কেউ যান, ওখানে থাকেনও। আমার গাইড কাম পোর্টার এর কাছ থেকে শোনা গেলো অনেক সুন্দর এ গ্রামটা। আমার ভাগ্যে নেই এদিকে যাবার তাই ডানদিকের উঁচু নিচু পথ ধরি, তেমন জটিল পথ না হলে কষ্ট কম হয়। নদীর পার ধরেই বেশীর ভাগ হাঁটা। রিমিসুং পৌঁছে খানিকটা বিশ্রাম। অনেক সুন্দর সুন্দর লজ আর রেস্তোরাঁ। বিশ্রামের আর্দশ জায়গা, কিন্তু আমার সময় সীমাবদ্ধ। রিমিসুং থেকে টকটক পুরোটা পথই নদী, তীব্র স্রোতের শব্দ শুনতে শুনতে পথ চলায় অদ্ভূতমায়াময় আলো পাহাড়ের খাঁজ গলে এসে গায়ে লাগে। ‘টকটক’-এ দোকান পাট আছে,লজ এর সামনে সাজানো নানান উপকরণের পশরা। অবশ্যই অনেক বেশী দাম। এই পথটা পাড়ি দিতেই ক্লন্তি এসে ভর করে, আমার পরবর্তী গন্তব্য ‘মানজো’ অনভ্যস্ত আমি হাঁপিয়ে উঠি। সকালে তীব্র শীতে যথেষ্ট পোশাক পড়ে বেরিয়েছিলাম। একে ভারি পোষাক পড়ে হাঁটা কঠিন তার উপর ঘেমেএকাকার অবস্থা। ধীরে ধীরে আমি স্বাভাবিক পোশাকে ফিরে আসি। পিঠের ব্যাগের ওজন খুব বেশী ভারী মনে হয়। ‘চুমওয়া’ পৌঁছে ক্লান্তিতে পর্যুদস্ত আমি। কিন্তু থামা যাবে না মানজোর আগে। পেশাল আমাকে তাড়া দেয়। এখানে কিছু সবুজ ক্ষেত চোখে পড়ে যেখানে গম বা যব চাষ হয়েছে। উজ্জ্বল কড়া রোদ। একটা ছোট কোশী বা নদী পেড়িয়ে মানজো। ক্ষিদেয় আমার কাহিল অবস্থা। কিন্তু মানজোর শেষ মাথায় হলো নেপাল সরকারের অফিস যেখানে অনুমতি পত্র এন্ট্রি করে ঢুকতে হয় ‘সাগরমাথা’ ন্যাশনাল পার্কে।

সাগরমাথা ন্যাশনাল পার্ক ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজসাইট। আয়তন ১১৪৮ বর্গ কিলোমিটার। যদি সমতল ভূমিতে অবস্থান হতো হয়তো অনেক বিশাল নয় কিন্তু এই পার্কেই। অবস্থান বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের আর পার্ক পুরোটাই দূর্গম পাহাড়ী বুনো রহস্যে ঠাসা। পুরোদস্তুর গেইট আছে প্রবেশ মুখে। কাঠমন্ডু থেকে করে নিয়েআসা ঞওগঝ কার্ডটি ওখানে পাসপোর্ট সহ দেখাতে হলো। ঞওগঝ মানে হল ট্রেকিং ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিসটেমস্। ১০ ডলারের বিনিময়ে এটা জোগাড় করতে হয়। ছোট একটি ভবনে খুব দ্রুততায় নাম এন্ট্রি হয়ে গেল। একটু সময় নিলাম। কয়েকজনের সাথে কথাবার্তা হলো। ভারতীয় পরিব্রাজক আছে তবে তারা বেশীরভাগই অনিবাসী ভারতীয়। হয় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে বাস করে নতুবা ইউরোপে। চেকপোষ্ট পার হতেই বিশাল দেয়ালে শেরপা ভাষায় লেখা প্রার্থনা বাক্য তারপর উৎরাই বহু নিচে নদী তার উপর দিয়ে ঝোলানো ব্রিজ। ব্রিজ পার হলে জোরেসালে আমার পরবর্তী গন্তব্য, প্রচন্ড ক্ষুধার্ত আমি, খাব ওখানে। ব্রিজ পার হবার পর প্রথম রেষ্টুরেন্টে -এই খেতে বসলাম আমি। আবার সেই জেসান এর সাথে দেখা। উল্টো দিক থেকে দক্ষিণ ভারতীয় একদল পরিব্রাজক প্রবেশ করলো, সবাই মনে হয় আমার মতই ক্ষুধার্ত। দ্রুতগতিতে খাওয়া শেষে একটু আয়েশ করে বিশ্রাম নেবো কিন্তু পেশাল তারা দিলো। আমার বই পড়া জ্ঞানে আর একটু গেলেই নামচে বাজার। এ অঞ্চলের সব চাইতে বড় বসতি আর দোকান পাট, যাকে শেরপা রাজধানী বলা হয়। সাগরমাথা জাতীয় উদ্যানের শুরু জোরেসাল থেকেই। একটা রোমাঞ্চকর অনুভব ঘিরে ধরে। পৃথিবীর এমন রহস্যময় অরণ্য আর সুউচ্চ পর্বতমালার মিশ্রণ আর কেথায় পাবো! যে রেস্তোরাঁয় বসে খেলাম তার পাশদিয়ে বয়ে চলেছে দুধ কোশী নদী। এই নদীটা যেন পিছু ছাড়ছেই না, পথ জুড়ে এর প্রচন্ড পানির তোড়ের শব্দ অরণ্য আর পাহাড়ের নিরবতা ভেঙ্গে সঙ্গ দেয়। ৯৩৩৪ ফুট উচ্চতা থেকে শুরু এই জাতীয় উদ্যান ২৯২৯ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৬০০০ ফুটের বেশী উচ্চতায় ঊষর ভূমির পরিমাণ ৬৯ শতাংশ। পুরো পার্কটি জুড়েই চড়াই উৎরাই, খরস্রোতা নদী ও পৃথিবীর বৃহত্তম গ্লেসিয়ার বা হিমবাহ। যে অংশ জুড়ে গাছপালা আছে সেখানে বার্চ, জুনিপার, ব্লু-পাইন, বাঁশ, ফার আর বিস্তর রনডেনড্রনের ঝাড়। উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে তা শেঁওলা আর মসেস নামক ছোট নরম গুল্মে পরিণত হয় আর ১৮৮৬০ ফুট উচ্চতার পর হিমালয়ের স্থায়ী বরফের লাইনের কারণে কোন উদ্ভিদ বা গুল্ম জন্মে না। বনের নিচের দিকে পাইন আর হেমলক গাছে ছাওয়া। ১১৫০০ ফুট বা তার উপরে সিলভার ফার, বার্চ, রনডেনড্রন আর জুনিপার গাছ দেখা মেলে।

এই উদ্যানে কমপক্ষে ১৫২ প্রজাতির পাখির দেখা মেলে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিমালয়ান মোনাল, ব্লাড ফিসান্ট, রেড বিলড্ কফ, ইয়োলো বিলড্ কফ। সাগরমাথা ন্যাশনাল পার্ক বেশ কিছু বিরল স্তন্যপায়ী প্রাণীর বাসস্থান যার মধ্যে মাস্ক ডিয়ার, লিউপার্ড, হিমালয়ার ব্ল্যাক বিয়ার, লাল পান্ডা, হিমালায়ন থার, লেঙ্গুর বানর, হিমালয়ান নেকড়ে অন্যতম। যদিও অক্সিজেনের চাপ যত উপরে ওঠা যায় ততই কমতে থাকে কিন্তু এসব বন্য প্রাণী কম অক্সিজেন ও প্রচন্ড ঠান্ডায় জীবন ধারনে অভিযোজন সক্ষম। আগেই বলেছি এটা ইউনেস্কো কর্তৃক সংরক্ষিত হেরিটেজ সাইট। ১৯৭৯ সালে ১৯ জুলাই এটিকে হেরিটেজ লিস্ট এর ১২০ নম্বরে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। উদ্যানের  মাঝে ২,৫০০ শেরপা বাস করে, মূলত এরা তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। এদের মূল পেশা কৃষি ও বাণিজ্য নির্ভর। তাদের সম্পদ এই উদ্যানের মধ্যে আইনগতভাবে বৈধতা দেয়া হয়েছে। শেরপা সংস্কৃতি দ্বারা এ অঞ্চলটি প্রভাবিত। শেরপাদের নানান গাঁথা সুবিদিত। তারা ১৪০০ সালের শেষ দিকে অথবা ১৫০০ সালের শুরুর দিকে পূর্ব তিব্বতের খাম অঞ্চলের সালসে গ্যাং থেকে ২,০০০ কি.মি. দূরে এখানে এসে বসবাস শুরু করে। মূলত সামরিক ও রাজনৈতিক চাপে তারা স্থানান্তরিত হয়। শেরপারা দুটো গ্রুপে পূর্ণবাসিত হয় খুম্বু আর সোলু এই দুই অঞ্চলে। দুটো ক্ল্যান বা জাতি গোষ্ঠী (মিনইয়াগপা ও থিমি) খু¤ু^ অঞ্চলে ১২ টি সাব ক্ল্যান বা জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত। শেরপারা তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মের নিগমপা গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত। যা বিশিষ্ট ধর্মগুরু পদ্মসম্ভাব রিমপোচে কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। কথিত আছে গুরু রিমপোচে ধানাখোশা লেকের মধ্যে ৮ বছরে বালক হিসাবে পদ্ম ফুলের মাঝে আবির্ভূত হন। ধানাখোশা লেক সোয়াত উপত্যকায়, বর্তমানে পাকিস্তানে পড়েছে। গুরু পদ্মসমম্ভাবের ৭ লাইনের প্রার্থনা খুবই বিখ্যাত এবং বহু তিব্বতীয় প্রতিদিন তা পাঠ করে থাকে। পথের ধারে এই গুরু রিনপোচের নানান মন্ত্রের বাহার। জোরেশালে ছোট গ্রাম, আপেল বাগান আর ছবির মত চমৎকার কিছু লজ, পাশ দিয়ে বয়ে চলা দুধ কোশী নদী। লজগুলো দেখলেই মনে হয় থেকে যাই।

বাগানে ছড়ানো চেয়ারে গা এলিয়ে অলস সময় কাটাই সবুজ ঘাসের মাঝে। আপেল গাছ ভূটানে প্রচুর দেখেছি কিন্তু এখানে আপেল ফুলে ভরা বাগান দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। একটি সামরিক চেকপোস্ট আছে আবার নদী পার হবার আগে। টিমস কার্ড ও পাসপোর্ট দেখাতে হয়, তারপর নদী পার। আমার পোর্টার কাম গাইড নদীর পার ঘেঁষে হাঁটতে বললো, এটা বলে র্শট কাট। নদীর পারে বেশ খোলামেলা পথের কোন নির্দিষ্ট চিহ্ন নেই হাঁটবো, তাই দেখে শুনে পা ফেলতে হচ্ছে। তীব্র খরস্রোতা নদীর পানি পাথরে আছড়ে পড়ছে মাঝে কিছু কিছু জয়গায় নির্জনতা ছাপিয়ে ওঠা শব্দ ভয় ধরিয়ে দেয়। নদীর ধার ধরেই লারজা ডোবান এলাকা, এখানে কোন জনবসতি নেই তাই নামচে বাজারের আগে আর কোন দোকান পাট কিছুই নেই। লারজা ব্রিজ পার হতে হলে এখন উঁচুতে উঠতে হবে। খুবই খাড়া পথে বহু উঁচুতে লারজা ব্রিজ। এদিকে সূর্য পশ্চিমে হেলান দিয়েছে। আমি তখনো সত্যিকার ধারণা করতে পারিনি নামচে বাজার কতদূরে। লারজা ব্রিজটি এ পথের মধ্যে সবচাইতে ভীতিকরভাবে বড়। প্রচন্ড বাতাস আর নিচে গভীর নদী। এখানেই ভোটে কোশী আর দুধ কোশী মিলেছে তার স্রোত ভয়ংঙ্কর। ক্রমাগত প্রচন্ড বাতাসে দুলছে ব্রীজ। কোনমতে ব্রীজ পার হবার পালা শেষে আরও সরু পথে নিচে নামতে হবে। একটু এদিক সেদিক হলে আর রেহাই নেই। সমস্ত মনোযোগ দিয়ে নিচে নামলাম, আজ ভাগ্য ভালো কালকের মত বৃষ্টি পেয়ে বসেনি। উজ্জ্বল রোদের আলো পড়ন্ত এখন আর পাহাড়ের খাঁজে তা কিছুটা অন্ধকারে রূপ নেয়া। এখান থেকে শুধু উপরে উঠার পালা। মনে হচ্ছে না দুপুরে কিছু খেয়েছি। মাউন্টেন স্টিক এ ভর দিয়ে এগিয়ে চলেছি। একজন শেরপার সাথে দেখা হলো যিনি সকালে তার খদ্দেরকে লুকলায় প্লেনে তুলে চলে এসেছেন এত দূর, খুব ফূর্তিতে আমি অবাক হলাম। এদিকে আমার গাইড কাম পোর্টার এর পেটের পীড়া শুরু হয়েছে। বেচারা একটু পর পরই হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। পানি ফুরিয়ে এসেছে আমার তার মধ্যে থেকে তাকে ভাগ দিতে হলো। আমার দেশ থেকে আনা শুকনো খাবারের ভাগ দিলাম দু’জনকে তারপর হাঁটা শুরু।

ক্রমাগত পথে লোকজন কমে গেলো। সূর্য পশ্চিমাকাশে অনেকটাই হেলে পড়েছে দূর পাহাড়ের আড়ালে গেলেই আলো কমে যাবে। দু-ধারে দূর্গম অরণ্য আর নিরেট পাথর। এর মধ্যে দৌড়–তে দৌড়–তে ২০-২২ বছরের সাদা চামড়ার ছোকড়া এসে হাজির। আমাকে দেখে বললো, যাক আমি ভেবে ছিলাম আমিই শেষ মানুষ এ পথে তুমি আছো ভালই হলো। কি অসুরে প্রাণশক্তি ছেলেটির লুকলা নেমে আজই চলে এসেছে এতদূর, নামচে গন্তব্য, আমি অবাক হই। এর আগে ছোকড়া অন্নপূর্ণা রেঞ্জও ঘুরেছে জানালো। প্রসঙ্গক্রমে জিজ্ঞেস করলাম কোন দেশ থেকে এসেছো, উত্তর ইসরায়েল, আমাকে জিজ্ঞেস করায় বাংলাদেশ বলায় আঁতকে উঠলো চোখ গোল গোল করে বললো তুমি নিশ্চয় হিন্দু, না সূচক মাথা নাড়তেই ছোকড়া মনে হলো উর্ধ্বশ্বাসে দৌড় দিলো। এবার আমার অবাক হবার পালা, ৮ দিন বাদে ছোকড়ার সাথে এভারেষ্ট বেইস ক্যাম্পের দোরগোড়ায় আবার দেখা। জিজ্ঞেস করলাম তুমি কি আমাকে হেজবুল্লাহ্ গ্র“পের টেররিষ্ট ভেবেছিলে কিনা, সে দিন যে অমন দৌড়ে ভাগলে! মৃদু হাসে। নামচে পৌঁছে বেচারা অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাই অত তাগড়া পালোয়ানি করেও আমার মত কচ্ছপের সাথেই তাকে এভারেষ্ট দর্শন করতে হলো। শুধু শারিরীক সক্ষমতা থাকলেই চলে না এখানে, প্রতিটি অঞ্চলের উচ্চতা আর তাপমাত্রার সাথে খাপ খাওয়ানোর বিষয় গুরুত্বপূর্ণ খুব আর তাড়াহুড়ো পরিব্রাজকদের জন্য প্রাণহানীরও কারণ হতে পারে। সাধারণত যে দু’জায়গায় একলাইমাইজেশান এর জন্য অবস্থান নেয়ার কথা বলা হয়েছে, সেখানে অবশ্যই দু’দিন অবস্থান করতে হবে শরীরকে উচ্চতার সাথে খাপ খাইয়ে তাল মেলানোর জন্য। আমি সামনে এগিয়ে যাই।

আলো পড়ন্ত, পথে লোক সমাগম নেই বললেই চলে, এই খাড়া পাহাড় পেরিয়ে তবে নামচে বাজার। দু’একজন কদাচিৎ স্থানীয় অধিবাসী যারা দ্রুতগতিতে মালপত্তর বহন করে চলছে এ ছাড়া আর কোন পরিব্রাজক নেই। সূর্য পাহাড়ের আড়ালে নেমে গিয়েছে বহু আগেই। এই খাড়া পাহাড়ের খাঁজে একটা খোলা চত্বরে পেশাল বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছে, একটু স্বস্তি ফিরে এলো। এখান থেকে এভারেষ্ট দেখা যায় কিন্তু মেঘে ঢেকে রয়েছে আর আলোর স্বল্পতাও রয়েছে। আমার খাবার পানি শেষ, তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ, ক্লান্তিতে পা একটু এগুতে চাইছে না। পোর্টার পেশাল এর অবস্থাও কাহিল। এই শরীরে আমার ভারী ব্যাগ বহন করতে দেয়াটা অমানবিক কিন্তু আমি উপায়হীন। এই নির্জন জঙ্গলে আঁধার নেমে আসে যেন দ্রুত। আমার বাঁ পায়ের হাঁটুতে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করি, কিন্তু থেমে থাকার উপায় নেই। চড়াই পেরিয়ে পৌঁছতে হবে। ভরসা মাউন্টেন ষ্টিক দুটো দিয়ে ভর করে এগিয়ে যাওয়া, পথ যেমন ক্লান্তিকর দীর্ঘ তেমনি কষ্টকর, আমার পুরো শরীর অবশ হয়ে আসছে, ঘন অরণ্যে আমি নিঃসঙ্গ। হঠাৎ ভয় হারিয়ে যায়, ভাবি আসুক অন্ধকার, কি আসে যায়, কিন্তু কিছু দূরে গিয়ে বসে পড়ি ক্লান্তিতে, অল্প বিশ্রামে আবার হাঁটা শুরু।

দু’পাশে গভীর অরণ্য। আমি বোকার মতো কোন ঘড়ি সাথে আনি নি। উচিৎ ছিলো তাপমাত্রা ও উচ্চতা পরিমাপক যুক্ত প্লাষ্টিক বডির একটি ডিজিটাল ঘড়ি। এখানে ধনী গরিব সবার হাতে আছে, আমি না নিয়ে আসার জন্য আক্ষেপ পুরো পথেই করতে হয়েছে। পেশাল এগিয়ে চলে গেছে, প্রায় অন্ধকার পথে একা হাঁটছি যেন অনন্তকাল ধরে এই পথ চলা। দু’পাশে বিশাল বিশাল বৃক্ষ ছাড়া কিছুই নেই। আমার শারিরীক সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বইয়ে পড়েছি ফাঁকদিং থেকে ৬ ঘন্টায় পৌঁছে যাওয়া যায় নামচে,যদিও নিসর্গ আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে অতিরিক্ত কিছু সময় ব্যয় করেছি কিন্তু সবাই যারা রওনা দিয়েছিলো পৌঁছে গেছে আমি একা পথে, অবশেষে দূরে পথের ধারে একটা ঘর মত চোখে পড়লো সেই উত্তেজনায় ছুটে গেলাম। নামচে বাজার ঢের দেরী থাকলেও ঘরটি বনবিভাগের একটি চেক পোষ্ট আর জানান দিচ্ছে নামচে বাজার সামনেই। কেউ নেই বদ্ধ অন্ধকার। পথের সামনে কেমন আলো দেখা গেলো, ভাবলাম অবচেতন মনের কল্পনা বুঝি। না সত্যি সূর্য ডোবার পরও যে আলোর রেশ থাকে তা। আর কিছু দূর যাবার পর পথের পাশে মানুষ পেলাম জিজ্ঞসা করলাম আর কতদুর, পথ তো এদিকেই নাকি! সম্মতি সূচক মাথা নাড়ানো আমার মাঝে অনুপ্রেরণা যুক্ত করে, তবু যেন পথ শেষ হয়না অবশেষে একটি মানুষ দ্বারা নোংরা পথের পাশে কিছু ভাঙ্গা বাড়িঘরের কাছে পৌঁছলাম, ভাবলাম এই বুঝি নামচে, খুব হতাশা লাগলো কিন্তু পথের ধারে খেলতে থাকা শেরপা শিশুরা জানালো সামনের পাহাড়ের বাঁক ঘুরে তবে নামচে, আবার হাঁটা। নামচে বাজারে পৌঁছানোর আগে পাহাড়ের একটা বাঁক পুরো শহরকে আড়াল করে রেখেছে দূর থেকে, বাঁকের উপর থেকে দেখলাম পরিব্রাজক দল লজগুলোর বাইরে শেষ আলোর রেশটুকু গায়ে মাখছে। সিগারেট ফুঁকছে। কাঠের হওয়ায় অধিকাংশ লজে ধূমপান নিষিদ্ধ। হাতের নাগালের শহরে যখন ঢুকলাম ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে এসেছে।

শহরে ঢোকার মুখেই একটি অতিব সুন্দর হোটেল নেষ্ট এর সামনে পেশাল অপেক্ষা করছে। ঢুকতে গিয়ে ভাবলাম এতো ভালো হোটেলে কে জানে ভাড়া কত নেয়? সব হোটেল লজ এর মত ডাইনিং হল-এ ঢুকে ম্যানেজার এর সাথে কথা বললাম, রুমভাড়া ৪০০ টাকা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা। এতো কমে এই হোটেল, তাই জিজ্ঞেস করলাম গরম পানি সহ বাথরুম লাগানো রুমের ভাড়া কত?  ৩,০০০ জানালো, আমি হিসাব করলাম আমার ৪০০ টাকার রুমে থাকলেও খরচ ১,৫০০ ছাড়িয়ে যাবে, ফোন চার্জ, ক্যামেরা ব্যাটারী, গরম পানির গোসল সহ। আর রুমও ছোট ৪০০ টাকায়। ম্যানেজারকে পটানোর চেষ্টাকরি, ‘দেখ আমি ইউরোপ আমেরিকার মত বড়লোক দেশের লোক নই’ ম্যানেজার রমেশ জিজ্ঞসা করলো কোথা থেকে এসেছি? বাংলাদেশ বলতে সে আর ওখানে উপস্থিত তার বন্ধু বলে উঠলো তোমরা তো ক্রিকেট দারুণ খেলো। আর একটু হলেই চ্যাম্পিয়ানই হয়ে যেতে। যাও তোমার জন্য ১,৫০০ টাকা ভাড়া। দুদিনের জন্য রফা হয়ে গেলা।

ক্লান্তি নিয়েও আমরা বাঙালীরা দরদামে যে পঁটু তার প্রমাণ রাখলাম আর ক্রিকেটাররা জয়তু তাদের কল্যাণে আমার আরামদায়ক অবস্থান নিশ্চিত হলো। আটটার ডিনার শেষ হয়, আমার হাতে একদম সময় নেই আমি ওয়ার্ডার দিলাম স্যুপ, পিৎজা দিয়েই ছুট, সব ক্লান্তি ধূয়ে মুছে গরম পানিতে গোসল দেব। নামচে বাজার সোলো খুম্বু জেলায় সবচাইতে বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র ১১২৮৬ ফুট উচ্চতায় এর শুরু। নামচে বাজাররে উপরের অংশেই যেতে দম বেড়িয়ে যাবে। সমতলের মানুষ আমি, এটি অতি সুউচ্চ আমার জন্য আর শীতের কথা নাই বা বললাম। বাথরুমে আগুন গরম পানি, বুদ্ধি করে একটা বালতি আর মগ চেয়ে নিলাম। বেশ বড়সর ব্যাক্তিগত বাথরুম। গরম পানি বালতিতে ছাড়তে উষ্ণ বাষ্পে পুরো বাথরুম ভরে গেলো। অসম্ভব আরামদায়ক পরিবেশে গোসল সেরে খেতে গেলাম। বেশ উষ্ণ ডায়নিং হল ও এত মজাদার পিৎজা পাব আমি কল্পনাও করিনি। সবজি স্যুপ সহযোগে চমৎকার রাতের খাবার। মনেই হচ্ছিলো না আজ দুপুরের পর হতে কতটা উদ্বেগ উৎকন্ঠায় অমানুষিক পরিশ্রমের ক্লান্তি মাখিয়ে আমাকে এখানে আসতে হয়েছে। গরম পানি চব্বিশ ঘন্টা আমার রুমে। একটা বোতলে ভরে স্লিপিং ব্যাগের ভেতর রেখে দিলাম। বরফ জমানো শীতে কিছুটা স্বস্তি। পরদিন আমার অ্যাকলাইমাইজেশান দিন। অর্থাৎ উচ্চতার সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য আমার একদিন বিশ্রাম,তাই সকালেওঠার তারা নেই, পেশাল বললো এভারেষ্ট ভিউ পয়েন্ট দেখতে যাব কিনা,আমি মৃদু হেসে জানালাম যার দোড়গোড়ায় যাবার মনস্থির করেছি, বিশ্রামের দিনে অযথা কেন পরিশ্রম। পেশাল ইতোমধ্যে বাংলা বুঝতে শুরু করেছে। ওর স্থানীয় কথ্য ভাষার সাথে বাংলার ভালোই মিল আছে। একটু দেরিতেই ঘুম থেকে উঠলাম।

আজ আমি পশ্চিমা পরিব্রাজকের মত আয়েশ করে দেখবো নামচে বাজার। আর কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নেব। নামচে বাজার আমার ধারনার চাইতে বেশী আধুনিক, প্রচুর দোকান পাট। পাহাড়ের চড়ার সরঞ্জামই বেশী। এখানে আধুনিক খাবার রেস্তোরাঁ, বেকারী, ডিপার্টমেন্টাল ষ্টোর, ওষুধের দোকান সবই আছে। আছে একটি ব্যাংক ও সাথে এটিএম। প্রায় সব ধরনের ক্রেডিট কার্ড চলে এখানের দোকানগুলোতে মজার বিষয় এভারেষ্ট এর পথে শেষ জনবসতি গোরখশেপেও ক্রেডিট কার্ড চলে। সাইবার ক্যাফেও আছে। নামচে বাজারে দ্রব্যাদির দাম অনেক বেশী তাও নয়।কাঠমন্ডু থেকে একটু বেশী, অত উঁচুতে বহন করে নিয়ে আসার খরচটাতো যুক্ত হয়। আমার হোটেলের ম্যানেজার রমেশ জানালো হোটেলের কাঁচামালের সাপ্লাই আসে হেলিকাপ্টারে করে এখানে। নামচে বাজারের নিকটতম দুটো পর্বতচুড়া হলো ‘কংগে রি’ ২০২৯৯ ফুট উচ্চতায় বেশ বিস্তৃত পর্বত আমার হোটেলের বাগানে বসলে দেখা যায় এক পাশ পুরো আগলে রেখেছে বরফের প্রান্তর। আর সোজা তাকালেই থামসেরকু’র চূড়া ২১৭২৯ ফুট উচ্চতার।

‘থামসেরকু’ দেখতে অপরূপ সেই তুলনায় ‘কংগে রি’ বেশ ভীতি সঞ্চারক বটে। পেশাল আমাকে নিয়ে চললো শহর পরিভ্রমণে আর শুনেছি নিজে দরদাম না করে স্থানীয়দের দিয়ে কেনালে কম খরচ পড়ে। শেরপা শিশুরা অপরিচ্ছন্ন মাঠে নোংড়ায় খেলছে। শহর মানে বর্র্জ্য প্রচুর সৃষ্টি হবে আর তা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে বাধাগ্রস্থ করবেই। পাহাড়ি ঝিরির পাশ ঘেষে ভাঙ্গা পথ উপরে উঠে গেছে, ঝিরির পানি দিয়ে প্রার্থনা চক্র ঘোড়ানোর ব্যবস্থা আছে। এই দিকটা একটু দারিদ্র পীড়িত। দেখলাম কয়েকজন বসে জুয়া খেলছে দোকানে আর একটু উপরে উঠেই আমার আক্কেল গুরুম। চমৎকার সব জিনিসপত্র পাওয়া যায় কাঠমন্ডুর মতনই। পেশাল নিয়ে গেল আমাকে অনু শেরপার দোকানে। মূল বাজারটির তিন নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত। অনু শেরপার দোকানে প্রচুর পর্বতে ওঠার সরঞ্জাম। দু-একটির প্রতি লোভ হলো না তা নয় কিন্তু দাম দেখে দমে আসা ছাড়া উপায় নেই। তার দোকান থেকে একটি সত্যিকারে ডাউন জ্যাকেট দৈনিক ৮০ নেপালী রুপীতে ভাড়া করা হলো আবার ফিরে এসে আমার জামানত ৫,০০০ রুপী ফেরত পাব এই শর্তে। সাবধান করে দিলো যাতে আগুনের কাছে না যাই। বহুল ব্যবহৃত এই ডাউন জ্যাকেট নতুন কিনতেও এত টাকা লাগবেনা আমি নিশ্চত কিন্তু এখানে আমার আর বিকল্প নেই। যথার্থ উইন্ড চিটারও এখানে পাওয়া যায় কিন্তু অত দাম দিয়ে কেনার সাহস করলাম না। এখানে বেশ দামী দামী দোকান ও আছে। একটি ডিপার্টমেন্টাল ষ্টোরে ঢুকে নল দিয়ে পানি খাওয়া যায় এমন একটি জিনিস কিনলাম যা পিঠের ব্যাগে ঝুলিয়ে রাখা যায়। দেশে থাকতেও এটা দেখেছি আমেরিকান এ্যাম্বেসীর লোকজন প্রচন্ড গরমে ব্যাগের বাইরেবের করা নল থেকে পানি খায়। কিনলাম বটে কিন্তু আমার ও থেকে পানি টেনে খেতে নাভিশ্বাস, তার চাইতে আমার এলমুনিয়াম-এর ফ্লাক্সই ভালো। স্নিকার আর বাউন্টি খুব কমন খাবার পাহাড়ে আসা মানুষের কাছে, প্রচুর এনার্জি দেয়। দেশে প্রচুর দাম হওয়ায় আসার আগে দিল্লী থেকে বেশ কিছু নিয়ে এসেছিলাম।

নামচে বাজারে এসে মনে হয় অত কষ্ট করে আনাটা অর্থহীন ছিলো। এখানে তেমন বেশী দাম নয়। তবে নামচে বাজারের নির্দিষ্ট দু-একটি দোকানের বাইরে সারা পথেই এর দাম কয়েকগুণ বেশী। এখানে বেশ ক’টি বেকারী আছে, অসম্ভব সুন্দর গন্ধ বেরুচ্ছে পাশ দিয়ে যেতেই মনে হচ্ছে ঢুকে সব খাই। জার্মান বেকারীতে ঢুকে এ্যপেল পাই আর চিনামন রোল দিয়ে দুপুরের খাবার সারলাম। নামচে বাজারে এয়ারপোর্ট আছে বলে জানতাম ‘স্যাংবোচে এয়ারপোর্ট’ ১২৩০৩ ফুট উচ্চতায়। প্লাটিলাস পি-৬ পোর্টার প্লেন ৫ মিনিটে লুকলায় যায়। কিন্তু বিভিন্ন জনের কাছে প্রশ্ন করে এয়ারপোর্টের হদিস পেলাম না, তবে হেলিকপ্টার নামে সেখানে শহরের এক প্রান্তে অবস্থিত এই এয়ারপোর্ট। নামচে বাজার ছেড়ে যাবার সময় দেখা মিললো সেই এয়ারপোর্টের। যারা এয়ারপোর্ট শব্দটির উচ্চারণের সাথে সাথে এক ধরনের কল্পনা করে ফেলেন তাঁদেরধাঁধায় ফেলে দেবে নিশ্চত। আমি নামচে বাজারের আনাচে কানাচে ঘুরি নি, কারণ প্রতিটি স্থান হয় চড়াই না হয় উৎরাই তবে শহরটি সর্ম্পকেএকটি সাধারণ ধারণার জন্ম দিয়েছে। বাজারে দুটো ওষুধের দোকান চোখে পড়লো। ফেরার সময় ৬ রুপীর একপাতা প্যারাসিটামল ৩০০ রুপীতে কিনতে বাধ্য হয়েছিলাম। ওষুধগুলো নেড়েচেড়ে দেখলাম বেশীর ভাগই সাধারণ অসুস্থতার ওষুধ,পেটের পীড়া, বেদনা নাশক জাতীয় এবং মেয়াদ উর্ত্তীণ হয়ে গেছে, পরিব্রাজক দল নিজেদের প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সাথে করে নিয়ে আসে। অত্যাবশকীয় ওষুধডায়ামক্স যা ওষুধের দোকানের বাইরে ডিপার্টমেন্টাল ষ্টোরেও পাওয়া যায়, উচ্চতা জনিত অসুস্থতা মোকাবেলায় কার্যকর খুব তা সবার কাছ থেকেই জেনেছি।

নামচে বাজারে একদিন বিশ্রাম নেবার পালা কখন ফুরিয়ে গেলো টের পেলাম না, যখন দেখলাম থামসেরকুর চূড়া পড়ন্ত রোদ্দুরে অদ্ভূত মায়াময় লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। কুসুম কাংগুরুর উত্তরে চূড়া থেকে একটি বরফের রিজ পূর্ব দিকে ‘কাটোং গা’ পর্যন্ত চলে গেছে। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখলাম আলোর খেলা পর্বত জুড়ে। পাহাড়ী অঞ্চলে সন্ধ্যার পর চলাচল সীমিত হয়ে পড়লেও নামচে বাজারে সন্ধ্যায় লোকসমাগম মন্দ নয়। আইরিশ পাবে গান বাজছে। যে সমস্ত পরিব্রাজকের আগামীকালের তাড়া নেই তারা আয়েশ করে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে আমি আমার ডেরা হোটেল নেষ্ট এ ফেরত যাই। খুব সময় নিয়ে রাতের খাবার সারি, এখানেই পরিচয় ঘটে যক্তুরাষ্ট্র নিবাসী প্যাটেল বাবুর সাথে। একাই এসেছে আমার মতন পার্থক্য শুধু উনি ৬ মাস প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এভারেষ্টে আসার আগে, সাথে আলাদা গাইড ও পোর্টার ও সমস্ত যথার্থ উপকরণ সমৃদ্ধ। মজার মানুষ প্যাটেল বাবু, আমার দীর্ঘ পথ যাত্রায় বাকি পথ টুকুতে উনাকে প্রায় সব খানেই পেয়েছি। আলাপচারিতায় আনন্দময় হয়েছে সময়, রসিকতায় উনি অনন্য। বিশ বছর ধরে যুক্তরাষ্টের ভার্জিনিয়ায় বাস করেন, পেশায় ফার্মাসিষ্ট। পেশাল খুব সকালে রওনা হতে হবে বলে আমার আড্ডা শেষ করার তাগিদ দেয়।

সকাল হয় উজ্জ্বল রোদ্দুরে স্বাগত জানানো দিয়ে। দ্রুত নাস্তা সারি তারপর নামচে বাজারকে বিদায় জানানো। হোটেলটা চমৎকার লেগেছে। তাই ফিরতি যাত্রায়ও বুকিং রেখে যাই। যদিও নামচে বাজারে অনেক হোটেল, এমনকি পাঁচ তারকা খচিত হোটেলও আছে অতি উচ্চমূল্যের। হোটেল থেকে বেড়িয়ে ওঠাশুরু। শহরের অলি গলি ছাড়িয়ে উঠছি তো উঠছি। একসময় পুরো শহরটা একবারে চোখে পড়ে। দুরের ‘কংগে রি’ র পথে সুদৃশ্য একটা বাড়ি দেখে প্রশ্ন জাগে ওখানে কেমন করে যায় মানুষজন, দূর্গম খাড়া, পেশাল জানায় একমাত্র হেলিকপ্টার যায় ওখানে। শহরের শেষ প্রান্তে কতগুলো মনহরণকারী লজ চোখে পড়লো। মাস এর পর মাস এসব লজ এ থেকে যাওয়া বিরক্তিকর হবে না আমার কাছে। একটা মাঠ চোখে পড়লো ষ্টেডিয়াম এর মতন সমতল তার থেকে একটু এগিয়েই এয়ারপোর্ট। লোক বসতি পেড়িয়ে চলে এলাম উষর পাহাড়, গাছপালা কম, গা ঘেষে সরু রাস্তা মাঝে মাঝে বিপদজনক ভাঙাচোরাও আছে। তবে উৎকট চড়াই বা উৎরাই নেই। লাইন ধরে দেখলাম কিছু সুন্দরী রমণী হেঁটে যাচ্ছে। ২৮ জন রমণী এসেছে ইংল্যান্ড এর ওয়েলেস থেকে গন্তব্য বেইস ক্যাম্পই। তাদের গাইডেড ট্যুর, বোঝাই গেলো ট্যুর অপারেটররা তাদের দিয়ে ব্যবসা ভালোই করেছে। এই গ্র“পে অতি স্থূলকায় এক নারীকে দেখলাম, মনে মনে ভাবলাম সাহস আছে এর,যাওয়া তো পরের কথা এ পর্যন্ত এসেছে আর যাবে অতদূর সেটি ভবতে পেরেছে সেটাই কম কি? পুরো পথে কোথাও আমাকে কোন অনুদান দেবার আহ্বান জানান হয়নি, এখানে পথের ধারে বসে একজন চাইছে, কারণ এই রাস্তা মেরামত আর পথে পথে যে প্রার্থনা স্তম্ভ সেগুলোর ব্যবস্থাপনার জন্য। যৎসামান্য যাই দিচ্ছে সবাই। লিখে রাখতে হচ্ছে কে দিল, কোন দেশের ইত্যাদি।

বেইস ক্যাম্পের পথে নামচে বাজার ছাড়ার পড়ই একদিকে পাহাড় অন্যদিকে গিরিখাত আর বাকি পথ হয় অরণ্য না হয় তেমন বেশী খাদ নয়। দূরে তাকিয়ে একটি মনোরম ঝুলন্ত ব্রিজ। পেশাল জানাল জোরেশাল পার হয়ে ঐখানে সেই ‘লারজা ব্রিজ’ যা পার হওয়া খুবই কষ্টকর অভিজ্ঞতায় তা পর্যবাসিত হয়েছিলো। অথচ আজ কি সন্দুর মনে হচ্ছে তাকে। আর একটু এগিয়ে বাঁকে বিশ্রাম নেবার জন্য কিছু বেঞ্চ তৈরী করে রাখা আছে, এটি আর একটি এভারেষ্ট ভিউ পয়েন্ট কিন্তু দূরে মেঘের আধিক্যে আজও দেখা হলো না রহস্য মাখা এভারেষ্ট, যেহেতু পথের চড়াই উৎরাই কম তাই হাঁটার গতি ভাল, অসুবিধা উচ্চতায় অক্সিজেন কম থাকায় দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া। বৃক্ষহীন পাহাড়ের পালা শেষ ধীরে ধীরে দু’পাশে গাছ চোখে পড়ছে। এ যে সেই বিখ্যাত রডডেনড্রন বাগান। প্রচুর ফুল মনোরম এক দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে, মনে হচ্ছে স্বর্গের পথে হাঁটছি মর্ত্যলোকের আমি। কিছুদূর গিয়ে একটা লজ সামনে পাহড়ের গায়ে খোলা রেস্তরাঁ। গাইডের ট্যুরের পরিব্রাজকদের চা নাস্তা খাওয়ানো হচ্ছে। চমৎকার জায়গা, এখান থেকে বিখ্যাত ‘আমা দাবালাম’ শৃঙ্গ স্পষ্ট দেখা যায়। দুটো শৃঙ্গ আমা দাবালাম এর মূল চূড়া ২২৩৪৯ ফুট আর পশ্চিমে ছোট চূড়াটি ১৮৩৫১   ফুট। এখান থেকে শুরু করে ডিংবোচে পর্যন্ত ‘আমা দাবালাম’ পুরে পথের সঙ্গী। মনে হলো বৃত্তের কেন্দ্র ধরে ঘুরে আর এক পাশে পৌঁছানো। পশ্চিম আকাশের দিকে তাকালে আমা দাবালাম যেন নিরব সঙ্গী হিসাবে সঙ্গ দেয় সর্বদা।

১৯৬১ সালের ১৩ ই মার্চ নিউজল্যান্ডের মাইক গিল, ওয়ালী রোমানেস, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারী বিসপ আর যুক্তরাজ্যের মাইক ওয়ার্ড প্রথম আমা- দাবালাম চূড়ায় ওঠেন ‘সিলভার হাট’ সাইস্টিফিক এক্সপিডিশনের অংশহিসাবে যার নেতৃত্বে ছিলেন স্যার এডমুন্ড হিলারী। ২০০৬ এর নভেম্বরে ঝুল্ন্ত গ্লেসিয়ার থেকে বড় আকারের অ্যাভালাঞ্জে ৬ জন (তিন ইউরোপীয় ও তিন শেরপা) মারা যায়। এই ভিউ পয়েন্টে চমৎকার থাকার ব্যবস্থা আছে। এখান থেকে লোৎসে সার, তেবোচে, কাটেংগা, থামসেরকুও দেখা যায়। রডডেনড্রন বাগানের মাঝ দিয়ে এর পর হেঁটে চলা, ছোট ছোট ঝরনার শব্দ পথের সৌন্দর্য্যকে আরো রাঙিয়ে তুলছে। আর একটু এগিয়ে পথ চলে গেছে খুমজুং গ্রামের পথে। এটিও বেশ বড় গ্রাম এ অঞ্চলে। এ পথেই সোলো

খুম্বু অঞ্চলে ওম মানী চিহ্নিত দীর্ঘতম ওয়াল আছে। খুমজুং এ স্যার এডমুন্ড হিলারীর আবক্ষ মুর্তি আছে। গ্রামটি আর এভারেষ্টের পথের প্রায় সব জনবসতি খুমজুং গ্রাম উন্নয়ন কমিটির আওতায় পড়েছে। খুমজুং এ স্কুল আছে এবং নামচের পরই সবচাইতে বৃহৎ জনবসতি এ খানেই। আমার যাবার পথে পড়বে না খুমজুং, যদি হাতে সময় থাকতো তবে অবশ্য ঘুরে যেতাম। খুমজুং এ যাবার পথ ছেড়ে কিছুদূর এগিয়ে যাবার পর চৈতাং খারখা, বেশ অরণ্য আর পাহাড়ের মাঝে ছোট ছোট ঝর্নায় ভরা ছোট্ট গ্রাম, প্রচুর রডডেনড্রন ফুটে আছে। এই গ্রামটি পেরুনোর পর শুধু নামছি আর নামছি, যাবার পথে নামা ভয়ংকর, মানে ডাবল ওঠা। নামছি তো নামছিই, একটি নদী পেরুতে হবে, খিদে পেয়েছে প্রবল,পেশাল জানায় নদী পেরিয়ে তবে খেতে। নামাটা এত বেশী হয়ে গেলো মনে হলো যেন পুরো পাহাড়টাই নেমে পড়লাম। একটা লজের সাথে রেস্তরাঁয় লেখা থ্যাংবোচে যাবার পথেই এটি শেষ খাওয়ার জায়গা, আঁতকে উঠলাম, তবে কি এই খিদে পেটেই আমাকে বাকি পথ যেতে হবে। পেশাল অভয় দেয় নদী পেরুলেই আছে। নদী পেরুনোর পর বেশ ভাঙ্গাচোরা রাস্তা, মনটা ঈষৎ বিরক্ত হয় কই সেই রেস্তরাঁ। তবে বাঁক ঘুরতেই চমৎকার রডডেনড্রন বাগান পাশে খোলা জায়গায় পাথর দিয়ে আলাদা করা খাবার জায়গা। প্রবল বাতাস, মাথায় টুপি খুলে উড়ে দৌড় দিচ্ছে, মাঝে মাঝে ঝিরিঝিরি পানিও বাতাসের তোড়ে উঠে আসছে উড়ে।তাই ছোট্ট ঘরে আশ্রয় নেই এবার সাথে প্যাটেল বাবুও আছেন।খুবই ছোট্ট ঘর, সাথে আর তিনজন জার্মান বসেছে খেতে, আর কোনো জায়গা নেই। অর্ডার করলাম ভেজিটেবল স্যুপ আর নুডুলস। নুডুলস এ ডিম যুক্ত করলে অতিরিক্ত ১৫০ রুপী। আমি ডিমসহ অর্ডার করলাম। খাবার চলে এলো। পুরো পথে এত সু-খাদ্য খাইনি আমি। প্যাটেল বাবুও আমার সাথে একমত। এত দ্রুত তৈরী করে দিলো মজাদার খাবার। প্যাটেল বাবু প্রতি কাজেই তার পতœীকে নিয়ে রসিকতা করেন। বলল এবার তাকে এর কাছে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠালে মন্দ হয় না। কিন্তু তিন জার্মানের কাহিল অবস্থা, শর্শের তেলের ঝাঁজ আর কাঁচামরিচের ঝালে তারা নাস্তানাবুদ। বেশীরভাগ খাবার না খেয়েই তারা উঠে গেলো। খাদ্য বিরতির পর যাত্রার শুরুটা মনোরম। একটি নেপালী সেনাবাহিনীর ক্যাম্প আছে। তাকে ঘিরে প্রচুর রডডেনড্রন ফুটে আছে কিন্তু ছবি তুলতে সাহস হয়না, যদি সেনা নিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি করেছি বলে বেঁধে রাখে।

মনোরম পথের শেষ থাকে, শুরু হলো আমার পাহাড় ভাঙা, পেশাল জানাল অত কষ্ট হবে না। তবুও উচুঁতে তো ওঠা। গন্তব্য আমার থ্যাংবোচে। খুব বিখ্যাত জায়গা এটা, বিশেষ করে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা এখানে আসেন মনাষ্ট্রি দর্শনে। ১২৬৮৭ ফুট উচ্চতায় বলা যায় এটা মূল এভারেষ্ট ভূখন্ডে ঢোকার মুখে গ্রাম। খুবই ছোট্ট একটা জায়গা, অত উঁচু পাহাড়ে একটা বেশ বড় ঢালু মাঠ এক কোনে বিশাল মনাষ্ট্রি যা বহু দুর থেকেও দৃষ্টি গোচর হয় আর ৪/৫ টি ছোট ছোট লজ। থ্যাংবোচে থেকে একসাথে অনেকগুলো পর্বত চূড়া দেখা যায় ‘থাওচে’, ‘এভারেষ্ট’, ‘নুপুৎসে’, ‘লোৎসে’, ‘আমা দামালাম’ আর ‘থামসেরকু’। তেনজিং নোরগে যিনি প্রথম স্যার এডমুন্ড হিলারীর সাথে প্রথম এভারেষ্ট চূড়ায় উঠে ছিলেন তার জন্ম এখানেই থানি নামে গ্রামে, যাকে থ্যাংবোচে মনাষ্ট্রিতে পাঠানো হয়েছিলো সাধু হবার জন্য। খুম্বু ভ্যালীর এই গ্রামটি যেখানে অবস্থিত ৩৫০ বছর আগে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব আসে। লামা সংঘ্যা দরজি এখানে ও প্যাংবোচে গ্রামে সবচাইতেপ্রাচীন মনাষ্ট্রি ও ছোট ছোট প্রার্থানালয় প্রতিষ্ঠা করে ছিলেন।এখানের ধর্ম প্রচারক আর তাদের প্রার্থনাগৃহ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে বহু মিথ প্রচলিত। তবে বাস্তাবতা এ পর্বতমালায় থ্যাংবোচে মনাষ্ট্রি বর্তমানে বৃহত্তমও পরিব্রাজকদের অন্যতম আকর্ষণ ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় কিন্তু ১৯৩৪ সালে ভূমিকম্পের কারণে এটি ধ্বংস হয়ে যায়। পরপর তা আবার মেরামত করে আগের রূপে ফিরিয়ে দেয়া হয়। ১৯৮৯ সালের ১৯ জানুয়ারীর এক অগ্নিকান্ডে এটি আবার ধ্বংস হয়ে যায় এবং পুনরায় স্বেচ্ছাসেবক ও বৈদেশিক সাহায্যে পুনঃনির্মাণ করা হয়। লামা গুলু এই মনাষ্ট্রি নিমার্ণ করেন। ১৯৩৪ এ তিনি জীবিত ছিলেন না, তার উত্তরসূরী উমজে গেলডেন’র উদ্যোগে নাগওয়ং তেনজিং নবরু’র সক্রিয় সহযোগিতায় তা আবার নির্মিত হয়। অনেক মূল্যবান মূর্তি, ম্যুরাল, কাঠের কারুকাজ সবই আগুনে পুরেযায়। তেনজিং নোরগে এ অঞ্চলের বাসিন্দা হওয়ায় সকলের দৃষ্টি এ মনাষ্ট্রির প্রতি আকৃষ্ট হয় বেশী।

থ্যাংবোচে অত্যন্ত সুন্দর জায়গা। আমার পৌঁছুতে পৌঁছুতে মেঘ জমে গেল, প্রচন্ড ঠান্ডা। যে লজে উঠলাম ভাড়া মাত্র ২০০ হলেও খুব একটা যুৎসই নয়, বিশেষ করে নামচে বাজারের তুলনায়। আমার লজের গা ঘেষেই মনোরম একটা লজ কিন্তু আজ সব আসন পূর্ণ। পথে আমার পুরোনো সাথী জেসান অবশ্য জানিয়ে ছিলো আর এক ঘন্টা হেঁটে গেলে নদীর পারে চমৎকার একটা গ্রাম আছে ডেবুচে নামে, ও ওখানে গিয়ে থাকবে। আমার শরীর সায় দিচ্ছিলো না। আর থ্যাংবোচে মনাষ্ট্রি ঠিকমতো না দেখে চলে যাওয়া অন্যায়, এমনিতেই এর প্রধান উৎসব মাস অক্টোবরেনা আসায় আক্ষেপ কাজ করছে খুব। মনিরিডিমু উৎসব জগৎজুড়ে এর সুখ্যাতি নিয়ে আছে এই থ্যাংবোচেতেই। তিব্বতীয় পঞ্জিকার দশম চন্দ্রমাসে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। ইংরেজী অক্টোবর-নভেম্বরে এটা হয়। নয় দিন ব্যাপী এ উৎসবে প্রচুর লোকসমাগম হয়। শরতে ট্রেকিং আসা পরিব্রাজকরাও অংশ নেয়, উপভোগ করে এ বর্ণিল উৎসব। ধর্মীয়ভাবে এ উৎসবে দুটো অংশ একটি উৎসব আর এটি বিশেষ ধরনের মেডিয়েশান, এই মেডিয়েশান এর নাম দ্রুবচেন যা তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মবলম্বীরা ১০ দিনব্যাপী করে থাকে। মানি রিমডুর মানে হলো ‘মানি’ যেটা অবলোকতিশ্বর এর প্রতি প্রার্থনা আর ‘রিমডু’ মানে ছোট লাল পবিত্র ট্যাবলেটের মতন জিনিস যা অংশগ্রহণকারী সকলের মাঝে বিতরণ করা হয়ে থাকে। এই উৎসবে এ ১৬ টি নাচ পরিবেশন হয় এবং তা থেমে থেমে নানান মজার বিষয় বিবৃত হয়। মংকরা মুখোশ পড়ে বর্ণিল নৃত্যের মধ্য দিয়ে অসুরের ধ্বংস আর তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মের জয়গান তুলে ধরেন।

তিব্বতীয় বৌদ্ধর্ধমের ঐতিহাসিক প্রণেতা গুরু রিমপোচের জয় বন্দনা এ উৎসবের মূল সুর। নেপালের অন্যতম আকর্ষণ এই উৎসব। আমি আসার আগে রবিবাবুর যে নাটকটি নিয়ে রবীন্দ্র স্বার্ধশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দিল্লী ও কোলকাতা গিয়েছিলাম ঐ নাটকে ‘মানি রিমডু’ নাচ নির্দেশক ব্যবহার করে নাটকের বৈচিত্রময়তা বাড়িয়ে তুলছে পাহাড়ের জনগণের অধিকারের কথা তুলে ধরায়। থ্যাংবোচে পৌঁছে লজে ঢোকার পর ক্লান্তিতে বিধ্বস্থ হলেও তিব্বতীয় ধাঁচে গড়া এমন বাড়িতে এই প্রথম। এর বাথরুম একেবারে বাইরে। বিদেশী সাদা চামড়ার লোকজন এই ঠান্ডায়ও খালি গায়ে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার হচ্ছে। আমি দ্রুততায় মুখে চোখে পানি দিয়ে বাকিটা রুমের ভেতর ভেজা টিস্যু পেপারের মাধ্যমেই সারি। অতটা পরিষ্কার নয় লজটি কিন্তু চারিদিক থেকে যেন তুষারের পাহাড়গুলো ঘিরে ধরেছে। আজ আমার ডাউন জ্যাকেট ব্যবহারের প্রথম দিন। আসলেই এই জ্যাকেটটি বেশ কার্যকর। অতি ঠান্ডায় বেশ দ্রুত শরীর গরম করে দেয়। ভাবলাম লজ এর বাইরে গিয়ে কিছু ছবি তুলবো। কিন্তু আলো খুব কম। এত বেশী ঠান্ডায় ক্যামেরার ফোকাস ঠিক করে ছবি তোলা মুশকিল। মাঝের ঢালু মাঠের দিকে তাকালে সাধ্যকার বোঝায় এটি কত উঁচুতে। মাঠে কয়েকটা ইয়াক চড়ছে।

র্জামানি একদল পরিব্রাজক আমার সাথে একই লজে আর নিঃসঙ্গ এক জাপানী বয়স্ক মহিলা। খাবার এসেই অর্ডার করেছি। সন্ধ্যে সাতটার মাঝে খাবারের পাঠ চুকানোর তাড়া থাকে, এখানে সর্বোচ্চ আটটা। র্জামান দলের সাথে জমে ওঠে না। জাপানী মহিলা প্রতিবছরই একা আসেন এই দূর্গম জনপথে একবার। সারাদিনের পরিশ্রমে যথেষ্ট ক্লান্ত ছিলাম। গোগ্রাসে সমস্ত খাবার চেটেপুটে শেষ। জাপানী মহিলা খাবারের অর্ডার বেশ করলেও কিছুই খেলনা,আমি অবাক হলাম এদের প্রাণশক্তির রহস্য কি? খাওয়া শেষে রুমে ঢোকার জন্য খোলা আকাশের নীচে যেতেই বৃষ্টি মতন শুরু হলো, আসলে বৃষ্টি নয় তুষারপাত। জীবনে প্রথম তুষারপাতের অভিজ্ঞতা তাও এমন উচ্চতায়। প্রচন্ড শীতে দাঁড়ানোর  জো নেই, দ্রুত রুমে ঢুকে ঘুম। থ্যাংবোচে তো আমারই সাথে এসেছে দুটো বড় গ্র“প একটির কথা আগেই বলেছি ওয়েলেস-এর ২৮ নারীর দল আর একটি হলো ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়েলডান সোসাইটির সব ডাক্তারকুল। সন্ধ্যার আগ দিয়ে জ্যাকেটে ও টুপির ফাঁক গলে এক ভারতীয় চেহারার লোক আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। প্রথম ভুল করে ভেবেছিলাম আসিফ মুনীর তন্ময় ভাই কিনা। পরে ভালো করে দেখলাম উনি নয়, অন্য কেউ ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে তৈরী হয়ে যাওয়া পরবর্তী গন্তব্যের জন্য। তৈরী হয়ে দ্রুত নাস্তা সেরে বাইরে এলাম থ্যাংবোচে মনাষ্ট্রির কিছু ছবি তুলবো বলে। অপূর্ব উজ্জ্বল আলোমাখায় বেশ লাগছে। মনে হচ্ছে সারারাত বৃষ্টি ধোয়া আকাশ যেমন উজ্জ্বল তেমনি, কিন্তু ঠান্ডা প্রবল।

সকালে যাত্রার শুরুতে ওয়েলডান সোসাইটির একজন এসে আলাপ করলো ষ্পষ্ট বাংলায়, ভদ্রমহিলা ভারতীয় বোঝা যায় কিন্তু এমন পরিষ্কার বাংলা আশা করিনি। জিজ্ঞাসা করলেন আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা? ড. বানু দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আর কাল সন্ধ্যায় যাকে আসিফ মুনির তন্ময় মনে করে ছিলাম উনি তার স্বামী। বিহার রাজ্য বাড়ি হলেও পশ্চিমবঙ্গে বেড়ে ওঠায় বাংলা রপ্ত ভালই করেছেন তিনি। অত্যন্ত স্বজ্জ্বন মহিলাটি পরবর্তীতে আমাকে কত যে উপকার করে  কৃতজ্ঞ করেছেন, এই দূর্গম অঞ্চলে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। থ্যাংবোচে থেকে যাত্রার শুরুটা বেশ আরামদয়ক ভাবে রডডেনড্রন বনের মধ্য দিয়ে নেমে যাওয়া। বাঁ দিকে নদী ঘেষে ডেবুচে গ্রাম, অতীব সুন্দর গ্রামটি। বেশ খানিকটা নিচে থ্যাংবোচে থেকে কিন্তু নামাটা কষ্টকর নয় কারণ খাড়া ঢালু পথ নয় আরামদায়ক। ডেবুচে গ্রাম এ বিশ্রাম কিছুক্ষণ। এই গ্রামে বেশ চাষাবাদ হয়।

Top
antalya escort bursa escort adana escort mersin escort mugla escort